প্রগতি ত্রিপুরা, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫: ব্যাঙ্গালোর বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন ত্রিপুরা বিধানসভার অধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধু সেন। শনিবার সাড়ে তিনটা নাগাদ তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয় ব্যাঙ্গালোর থেকে আগরতলা বিমানবন্দরে। বিমানবন্দর প্রাঙ্গণেই তাঁকে শেষে শ্রদ্ধা জানান মন্ত্রী, বিধায়ক, প্রশাসনিক আধিকারিকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নিয়ে আসা হয় বিধানসভায়।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল ইন্দ্র সেনা রেড্ডি নাল্লু, মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ মানিক সাহা, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী সহ বিধানসভার বিধায়করা। বিধানসভা প্রাঙ্গণে প্রয়াত অধ্যক্ষের প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেডি নাল্লু, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডাঃ) মানিক সাহা, বিদ্যুৎমন্ত্রী রতন লাল নাথ, অর্থমন্ত্রী প্রণজিৎ সিংহ রায়, পর্যটনমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী সান্ত্বনা চাকমা, যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী টিংকু রায়, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী কিশোর বর্মণ, তপশিলি জাতি কল্যাণমন্ত্রী সুধাংশু দাস, সমবায়মন্ত্রী শুক্লাচরণ নোয়াতিয়া, বনমন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা, রাষ্ট্রমন্ত্রী বৃষকেতু দেববর্মা, বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী, টিটিএএডিসি’র চেয়ারম্যান জগদীশ দেববর্মা এবং বিধানসভার অন্যান্য সদস্যসহ প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেড্ডি নাল্লু বলেন, বিশ্ব বন্ধু সেন ত্রিপুরার রাজ্যের অন্যতম নেতৃত্ব ছিলেন। চারবারের বিধায়ক ছিলেন তিনি। যখনই উত্তর জেলা সফরে যেতেন তখনই বিশ্ববন্ধু সেনের সঙ্গে দেখা হতো। জেলা, বিধানসভা সহ গোটা রাজ্যের উন্নয়নের সম্পর্কে কথা বলতেন। একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন তিনি। অপরদিকে মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার মানিক সাহা প্রয়াত অধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধু সেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন,বিশ্ববন্ধু সেন ছিলেন কবি, সংস্কৃতিমনস্ক ও যাত্রা–নাট্যজগতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একজন সুনাগরিক।
তাঁর প্রয়াণে রাজ্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ৮ আগস্ট সেরিব্রাল স্ট্রোকে আক্রান্ত হন বিধানসভার অধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধু সেন। ৮ আগস্ট সকালে সরকারি বাস ভবন থেকে মহাকরণে যান বিশ্ববন্ধু সেন। তখন তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। মহাকরণে যাওয়ার সময় রাস্তায় দাড়িয়ে একটি গাছের পরিচর্যা করেন। তখন ওনাকে দেখে মনে হয় নি তিনি সুস্থ নন। মহাকরণে কাজ শেষ করে যান সরকারি বাসভবনে। তারপর বিকালে ধর্মনগরস্থিত নিজ বাসভবনে যাওয়ার জন্য আগরতলা রেল স্টেশনে পৌঁছান। রেলে উঠেন সন্ধ্যায়।
রেলের শৌচালয়ে আচমকা তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তারপর তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় হাপানিয়া হাসপাতালে। জরুরী ভিত্তিতে শুরু হয় তাঁর চিকিৎসা। প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর হাপানিয়া হাসপাতালে ধরা পরে বিশ্ববন্ধু সেনের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। জরুরী ভিত্তিতে মস্তিস্কে অস্ত্র পচার প্রয়োজন। হাপানিয়া হাসপাতালে পৌঁছান মুখ্যমন্ত্রী ডাক্তার মানিক সাহা।
তিনি কথা বলেন চিকিৎসকদের সাথে। হাসপাতালে পৌঁছান বিশ্ববন্ধু সেনের পরিবারের লোকজন। তাদের অভিমতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় সময় নষ্ট না করে বিশ্ববন্ধু সেনকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় আইএলএস হাসপাতালে। আগে থেকে আইএলএস হাসপাতালে পৌঁছে যান নিউরো সার্জন দেবদত্ত সাহা। বিশ্ববন্ধু সেনকে আইএলএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর জরুরী ভিত্তিতে নিয়ে যাওয়া হয় ও.টি-তে এবং করা হয় মস্তিস্কে অস্ত্রপচার। অস্ত্র পচারের পর বিশ্ববন্ধু সেনকে নিয়ে যাওয়া হয় আইসিইউ-তে।
এরই মধ্যে পরিবারের লোকজন বিশ্ববন্ধু সেনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরু এক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যথারীতি এয়ার এম্বুলেন্সে করে বিশ্ববন্ধু সেনকে নিয়ে যাওয়া হয় বেঙ্গালুরু এক বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে বিশ্ববন্ধু সেনের মাথায় পুনঃরায় অস্ত্রপচার করা হয়। তারপর ভেন্টিলেশনে রাখা হয় বিশ্ববন্ধু সেনকে। ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে বিশ্ববন্ধু সেনের। এরই মধ্যে আচমকা বৃহস্পতিবার বিশ্ববন্ধু সেনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
চিকিৎসকরা বিশ্ববন্ধু সেনের প্রান বাঁচাতে অপ্রান চেষ্টা করে। কিন্তু রাত ৩ টা ২০ মিনিট নাগাদ চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন বিশ্ববন্ধু সেন। একজন বন্ধুকে হারালাম। বিশ্ববন্ধু সেন দলের বরিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিলেন। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যাপক অভিজ্ঞ ছিলেন।
যেভাবে ত্রিপুরা বিধানসভা পরিচালনা করেছেন এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে আগামী দিন। ত্রিপুরাবাসীর জন্য বড় ক্ষতি বলে অভিমত ব্যক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী। অপরদিকে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা জিতেন্দ্র চৌধুরী অতীত স্মরণ করে বলেন বিধানসভার ভেতরে এবং রাজনৈতিক ময়দানে মতাদর্শগত কারণে বাক্য বিনিময় হলেও ব্যক্তিগত জীবনে ভালো সম্পর্ক ছিল বিশ্ববন্ধু সেনের সঙ্গে।
তিনি ধর্মনগরে রেল ডিভিশন স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। বিধানসভায় তিনি যেভাবে কথা বলতেন সেটা অত্যন্ত ভালো লাগতো। আজ তিনি নেই সেটা অত্যন্ত দুঃখের বলে জানান বিরোধী দলনেতা। তারপর সেখানে তাকে শোক সেলামী প্রদান করলেন টি এস আর জওয়ানরা। বিধানসভা থেকে অধ্যক্ষ বিশ্ববন্ধু সেনের মরদেহ নিয়ে আসা হয় প্রদেশ বিজেপি কার্যালয়ে। সেখানেও মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা সহ বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব প্রয়াত বিশ্ববন্ধু সেনকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।







