বিধানসভায় বেসরকারি প্রস্তাবের উপর আলোচনায় মুখ্যমন্ত্রী, সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই

অনলাইন ডেস্ক, ৩১আগস্ট, ২০২৬:  সন্ত্রাসবাদের পথ ছেড়ে আত্মসমর্পণ করে যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে তাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকার সব সময়ই চেষ্টা করছে। তাদের জন্য প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। এবিষয়ে যে গাইডলাইন আছে তা রূপায়ণের কাজ টেকনিক্যাল পার্সনরা দেখছেন। সমস্যা সমাধানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রীও এবিষয়ে বার বার কথা বলছেন, চেষ্টা করছেন। আজ বিধানসভা অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে উল্লেখ পর্বে বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মার আনা একটি নোটিশের উপর আলোচনা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন। বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মার আনা মূল নোটিশটি ছিল ২২ আগস্ট ২০২৬ আজকের ফরিয়াদ পত্রিকায় প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ত্রিপুরায় ৭২ ঘন্টা চাকা বন্ধের হুশিয়ারি প্রাক্তন জঙ্গীদের শীর্ষক সংবাদ সম্পর্কে’।

এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রী বিকাশ দেববর্মা বলেন, আত্মসমর্পণকারী ক্যাডারদের পুনর্বাসন এবং ত্রিপুরার জনজাতি অধ্যুষিত এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখে ভারত সরকার, ত্রিপুরা সরকার এবং এনএলএফটি (বিএম), এনএলএফটি (পিডি), এনএলএফটি (ওআরআই) ও এটিটিএফ-এর প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওএস) স্বাক্ষরিত হয়। এরমধ্যে এনএলএফটি (বিএম) -এর ৬৯ জন, এনএলএফটি (পিডি) এর ১৬ জন এনএলএফটি (ওআরআই) এর ৩ জন এবং এটিটিএফ এর ৩ জন।

প্রত্যেক প্রত্যাবর্তনকারীর জন্য তাৎক্ষণিক অনুদান হিসেবে ৪ লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হয়েছে এবং ৯১ জনের ক্ষেত্রেই তা ত্রিপুরা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের গুর্খাবস্তি শাখার স্থায়ী আমানত হিসেবে জমা রাখা হয়েছে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অংশ হিসেবে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে এবং তা ৩৬ মাস পর্যন্ত প্রদান করা হবে। এই সময়ে এমওএস এর ধারা ১২ অনুযায়ী প্রত্যেক প্রত্যাবর্তনকারী প্রতি মাসে ৬০০০ টাকা করে ভাতা পেতে থাকবেন। প্রযোজ্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা প্রদানের জন্য তাদের নাম ও জীবিকাভিত্তিক প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলিতেও পাঠানো হয়েছে।

জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, বনভূমি চেয়ে করা আবেদনগুলি সংশ্লিষ্ট জেলাগুলিতে পাঠানো হয়েছে। জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের বনভূমি বরাদ্দের ক্ষমতা নেই। এ ধরণের দাবি বনাধিকার আইন ও বিধি অনুযায়ী উপযুক্ত জেলা/মহকুমা স্তরের কমিটিকে পরীক্ষা করতে হবে। এমওএস এর ধারা ১২ অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৮-২৯ পর্যন্ত চার বছরে ত্রিপুরার জনজাতিদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ভারত সরকার ২৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করবে। প্যাকেজটির দায়িত্ব উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রক (এমওডিওএনইআর) কে দেওয়া হয়, যা ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এর বাস্তবায়ণের জন্য নির্দেশিকা জারি করে।

নির্দেশিকা অনুযায়ী রাজ্য সরকারকে যোগ্য প্রকল্পভিত্তিক প্রস্তাব চিহ্নিত ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে, দায়মুক্ত জমিরপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নির্বাচন ও মঞ্জুরির জন্য প্রস্তাবগুলি উপযুক্ত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।

পরবর্তীকালে, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে এমওডিওএনইআর স্পষ্ট করে যে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে কমিউনিটি প্রকল্প কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধাভোগীকেন্দ্রিক প্রকল্প কোনটাই গ্রহণ করা যাবে না। চারটি প্রত্যাবর্তনকারী গোষ্ঠীকেই এই স্পষ্টিকরণ ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে তাদের জমা দেওয়া বহু প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলির চিহ্নিত ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সঙ্গে সম্পর্কিত।

নির্দেশিকা পাওয়ার পর চারটি প্রত্যাবর্তনকারী গোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট লাইন দপ্তরগুলির সঙ্গে পরামর্শ করা হয়, যার মধ্যে ১০ অক্টোবর ২০২৫ ও ২৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের বৈঠকও অন্তর্ভুক্ত। জনজাতি কল্যাণ মন্ত্রীও তাঁদের দাবি ও অভিযোগ নিয়ে একাধিকবার প্রত্যাবর্তনকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। নির্ধারিত পদ্ধতি, জমির প্রয়োজনীয়তা এবং প্রকল্পভিত্তিক কনসেপ্ট নোটের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে গোষ্ঠীগুলিকে অবহিত করা হয়। ঘাটতিগুলি ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জানানো হয় এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে পুনরায় উল্লেখ করা হয়। নির্দেশিকা-সম্মত প্রস্তাব তৈরিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির সহায়তার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। জুন ও জুলাই ২০২৬-এ অভিযোগগুলি আরও পরীক্ষা করা হয়। জুন ২০২৬-এ এনএলএফটি ও এটিটিএফ গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রস্তাবগুলি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় জানানো হয়।

২৫০ কোটি টাকার এসডিপি সীমার মধ্যে প্রস্তাবগুলি পরীক্ষা, যুক্তিসঙ্গতিকরণ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য জনজাতি কল্যাণ দপ্তর ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটি ২০  ও ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বৈঠক করে; ওই সময় এনএলএফটি  (পিডি) ও এটিটিএফ নতুন প্রকল্প তালিকা জমা দেয়। চারটি গোষ্ঠী থেকে প্রাপ্ত সংশোধিত প্রস্তাবে মোট ১১৩ টি প্রকল্প ছিল, যার মোট ব্যয় ৩১০.৯৫ কোটি টাকা।

সংশোধিত প্রস্তাবগুলির মোট ব্যয় এসডিপি সীমার চেয়ে ৬০.৯৫ কোটি টাকা বেশি এবং সেগুলির আরও অগ্রাধিকার নির্ধারণ প্রয়োজন। সম্ভাব্যতা পরীক্ষা এবং নির্দেশিকা-সম্মত কনসেপ্ট নোট তৈরির জন্য প্রস্তাবগুলি সংশ্লিষ্ট লাইন দপ্তরগুলিতে পাঠানো হয়েছে। ১৪  আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়। চারটি প্রত্যাবর্তনকারী গোষ্ঠী এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির সঙ্গে ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আরও পরামর্শ করা হবে। ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি সম্পর্কে এমওডিওএনইআর-এর স্পষ্টিকরণের পরিপ্রেক্ষিতে, এ ধরনের জমি সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলি ওই পরামর্শের সময় পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

নথিপত্র থেকে দেখা যায় যে গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে এবং পুনর্বাসন ও এসডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নির্ধারিত ৩৬ মাস পর্যন্ত চলমান বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং ভাতা প্রদান অব্যাহত থাকবে। ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে নির্ধারিত পরামর্শের পর যোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাবগুলি এমওএস, এমওডিওএনইআর-এর নির্দেশিকা, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি সম্পর্কিত স্পষ্টিকরণ এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রক্রিয়াকরণ অব্যাহত থাকবে।

২২-০৮-২০২৬ তারিখে আজকের ফরিয়াদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি, ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ত্রিপুরায় ৭২ ঘণ্টার চাকা বন্ধের হুশিয়ারি প্রাক্তন জঙ্গিদের’ শিরোনামের সংবাদের প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, ২১-০৮-২০২৬ তারিখে আত্মসমর্পণকারী উগ্রপন্থী/প্রত্যাবর্তনকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী তিনটি সংগঠন, যথা এনএলএফটি (পিডি), এনএলএফটি (ওআরআই) এবং এটিটিএফ, আগরতলার মানিক্য কোর্টে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে ৭২ ঘণ্টার সমগ্র ত্রিপুরা বন্ধ/ধর্মঘটের ঘোষণা করেছে বলে জানা যায়। কর্মসূচিটির নেতৃত্বে ছিলেন বলে জানা যায় এনএলএফটি (পিডি)-এর সভাপতি পরিমল দেববর্মা, এনএলএফটি (ওআরআই)-এর সভাপতি প্রসেনজিৎ দেববর্মা @ Hastepha এবং এটিটিএফ-এর সভাপতি অলেন্দ্র দেববর্মা।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, যাচাইকৃত প্রত্যাবর্তনকারী/ক্যাডারদের ক্ষেত্রে সরকার ইতিমধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ত্রিপুরা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী ১২ জন নেতাকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা/পিএসও প্রদান করা হয়েছে। ৯১ জন যাচাইকৃত ক্যাডারের জন্য খুমুলুংএ কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং আগরতলার রাধানগর শেল্টার হাউস ট্রেনিং সেন্টারে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ১৩ জন ক্যাডার/নেতাকে পারিবারিক আবাসন/কোয়াটার প্রদান করা হয়েছে। ৯১ জন যাচাইকৃত ক্যাডারের প্রত্যেককে ৪ লক্ষ টাকা করে বিতরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। গোষ্ঠীগুলির জমা দেওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিপরীতে ইন্সেন্টিভ হিসেবে ৯,৪৫,৪৫০ টাকা প্রদান করা হচ্ছে। ত্রিপাক্ষিক চুক্তির বিধান অনুযায়ী যাচাইকৃত ক্যাডারদের অবশিষ্ট প্রাপ্য সুবিধা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলনেতা জীতেন্দ্র চৌধুরী এবং বিধায়ক রঞ্জিত দেববর্মাও আলোচনায় অংশ নেন।

Leave a Comment