অনলাইন ডেস্ক, ১৯ জুলাই, ২০২৫: ১৯শে জলাই ১৯৬৯-এ ভারত সরকার ১৪টি প্রধান বেসরকারী ব্যাঙ্কে জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তটি বেশ কয়েকটি আর্থ-সামাজিক উদ্দেশ্য এবং সেই সময়ে ব্যাঙ্কিং খাতে অনুভূত ঘটনাগুলির দ্বারা চালিত হয়েছিল।
ঐ সময়কালে জাতীয়করণের উদ্দেশ্য ছিল- ব্যাঙ্কিং পরিষেবার সম্প্রসারণ: প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ এলাকা এবং ছোট শিল্পগুলিকে ব্যাঙ্কিং সুবিধাগুলি প্রসারিত করা, যেগুলি মূলত শহর এবং বৃহৎ গ্রাহকদের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাঙ্কগুলিকে জনগণের মালিকানার অধীনে আনার মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করেছে যে ব্যাঙ্কিং নীতিগুলি বিশুদ্ধভাবে লাভের উদ্দেশ্যের পরিবর্তে বৃহত্তর জাতীয় উদ্দেশ্যে কার্যকরি হবে।
ঋণের উপর নিয়ন্ত্রণ: ব্যাঙ্ক জাতীয় করণের লক্ষ ছিল ঋণের অগ্রাধিকার মান যেমন কৃষি, শিল্প, মাঝারি শিল্প, যা কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের প্রেক্ষাপট নিয়ে বলতে হয় যে, জাতীয়করণের আগে, ভারতে ব্যাঙ্কিং সেক্টারে প্রাইভেট ব্যাঙ্কগুলির অধিপত্য ছিল, গ্রামীণ এলাকায় নজর ছিল কম, মূল ফোকাসটি ছিল নগর কেন্দ্রিক, বড় ব্যবসায়ী, বড় বড় শিল্পপতীদের উপর।
যার ফলস্বরূপ গ্রামীণ অর্থনীতির অবস্থা ছিল করুণ। ছোট বা মাঝারী শিল্প ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তদানিন্তন কেন্দ্রীয় সরকার ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের মাধ্যমে প্রবেশাধিকার প্রসারিত করেছে।
জাতীয়করণ গ্রামীণ এবং আধা শহর এলাকায় ব্যাঙ্কগুলির শাখা নেটওয়ার্ককে উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রসারিত করেছে, যার ফলে আর্থিক অন্তর্ভূক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি অগ্রাধিকার খাতের দিকে ঋণ ক্ষেত্রে এবং ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশের জন্য বিশেষ অবদান রাখতে পেরেছে।
এই পদক্ষেপটি ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্তা বাড়িয়েছে, কারণ দেশের মানুষ ব্যাঙ্কগুলিকে শুধুমাত্র লাভ চালিত সত্ত্বার পরিবর্তে জাতীয় উন্নয়নের উপকরণ হিসাবে দেখছিল। ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ দিবস ভারতীয় ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি ব্যাঙ্কিং সেক্টরে সমাজতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের দিকে অর্থনৈতিক নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন চিহ্নিত করেছে।
যার ফল স্বরূপ আমাদের দেশে গত পাঁচ দশকেরও বেশী সময় ধরে পাবলিক সেক্টার ব্যাঙ্ক দেশের সেবায় কাজ করছে – তা দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৃষি বিপ্লব, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র বিমোচন ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতির মতো অগ্রাধিকার খাতগুলিতে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে।
নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্পায়ন, রপ্তানী ইত্যাদিতে পাবলিক সেক্টার ব্যাঙ্কের অবদান অনশ্বিকার্য্য। প্রচুর ব্যাঙ্কিং শাখা খোলার জন্য আজ ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সাধারণ মানুষের উপলব্ধ। জাতীয়করণের ফলে শিক্ষিত যুবক / যুবতীদের প্রচুর পরিমানে ব্যাঙ্কিং শিল্পে কর্মসংস্থান হচ্ছে।
যারফলে আজকের দিনে যারা ৮ লক্ষের ও অধিক ব্যাঙ্ক কর্মচারী সারা ভারতবর্ষে কাজ করছে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভোমতকে রক্ষা করার জন্য। ব্যাঙ্ক কর্মচারীরা হচ্ছে দেশের অর্থনীতির সেনা (Financial Soldier) | ব্যাঙ্ককে উৎসাহিত করতে আগ্রহী।
যার ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ২০২৪ অর্থবর্ষ পর্যন্ত পাবলিক কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক কেন্দ্রীয় সরকার পাবলিক সেক্টার ব্যাঙ্কগুলির ভূমিকা কমিয়ে দিতে এবং বেসরকারী সেক্টার ব্যাঙ্ক শাখা হ্রাস পেয়ে দাড়িয়েছে ৯১,৪৪৫ থেকে ৮৯,৪৭৬ এ। অন্যদিকে প্রাইভেট ব্যাঙ্ক শাখা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪৬৬১ থেকে ৫৩,৮২৭ এ।
ব্যাঙ্কের শাখার সংখ্যা হ্রাস পেলেও দেখা যাচ্ছে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে পাবলিক সেক্টার ব্যাঙ্কের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে ২৬% তথা ১.৮৩ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু প্রাইভেট সেক্টার ব্যাঙ্কের মুনাফা বৃদ্ধি পেয়েছে মাত্র ৭% অর্থাৎ ১.৮৭ লাখ কোটি টাকা। সরকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারী ব্যাঙ্কগুলিকে পুজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া।
এই চিন্তা ভাবনা এবং পদক্ষেপগুলি দেশের আপামর জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী। সাধারণ মানুষের কষ্টর্জিত সঞ্চয় ব্যাঙ্কগুলি আমানত হিসাবে ধরে রাখে। তাই UFBU সরকারের এই প্রচেষ্টার তীব্র বিরোধিতা করে। এর পাশাপশি সরকার রাষ্ট্রের অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করারও প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
জাতীয় সড়ক, রেল, বিমানবন্দর, কয়লাখনি, খেলার স্টেডিয়াম, বীমা সবকিছু ন্যূনতম দামে বহু শিল্পপতিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। ১১ লক্ষ কোটি টাকার বৃহৎ শিল্পপতিদের ঋণ মুকুব করা হয়েছে। গত ১২ বছরে ভারতীয় ব্যাঙ্কে করা হয়েছে ১৪.৫৬ লক্ষ কোটি টাকা (৪৮.৩৬%)।
দেখা যাচ্ছে যে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সর্বমোট written off করা হয়েছে ১.৭০ লক্ষ কোটি টাকা তার মধ্যে কর্পোরেট ঋণের পরিমাণ ০.৬৮ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে অর্থাভাবের অজুহাতে সুদ কমানো হচ্ছে প্রবীণ নাগরিকদের সঞ্চয়ে।
UFBU দেশের আপামর আমনত কারীদের জন্য সুদের হার বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে, পাশাপাশি ব্যাঙ্কিং সেক্টারে কর্মী নিয়োগের জন্যও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পুজিপতিদের প্রতি ঝোঁকে সংকোচিত হচ্ছে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প।
প্রসারিত হচ্ছে ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণের প্রবণতা, যার প্রভাব পরতে পারে দেশের গরিব ও মধ্যবৃত্ত মানুষের অর্থনীতির উপর। কৃষক যাবে মহাজন ও মাইক্রো ফিনান্সের কাছে, ছোট শিল্পদ্যোগীদের জন্য বন্ধ হবে ব্যাঙ্কের দরজা। বাঁ চকচকে বেসরকারী ব্যাঙ্ক শুধু ধনী, ধান্দার পুঁজিপতি, ধনী কৃষকের সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
আজকের জাতীয়করণের এই ঐতিহাসিক দিনে বলতে হয় ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যাঙ্কিং শিল্পকে ব্যবহার করার প্রতিশ্রুতির প্রতীক, যা বিশেষ করে সমাজের প্রান্তিক, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধবিত্ত অংশগুলিকে উপকৃত করে এবং করে আসছে, যা ভারতীয় অর্থনীতিতে দৃষ্টান্তমূলক।তাই আজকের দিনে ডাক এসেছে ব্যাঙ্ক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও।








