অনলাইন ডেস্ক, ১৩ মার্চ, ২০২৬: জাতীয়স্তরে উন্নয়নের যে ধারা বইছে রাজ্যের বর্তমান সরকার তার সাথে তাল মিলিয়ে চলছে এবং ত্রিপুরাকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি রূপে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নিয়েছে। আজ চলতি বছরের রাজ্য বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্যপাল ইন্দ্রসেনা রেডি নান্নু একথা বলেন। রাজ্যপাল তাঁর ভাষণে রাজ্যের মানুষের আর্থ সামাজিক মানোন্নয়নে রাজ্যে যে উন্নয়নমূলক কাজকর্ম চলেছে তার বিস্তৃত তথ্য তুলে ধরেন। রাজ্য সরকারের কাজকর্মের বিভিন্ন দিক তার ভাষণে উঠে আসে।
রাজ্যপাল বলেন, ত্রিপুরার গ্রামীণ মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণকে শক্তিশালী করতে রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্প্রতি ত্রিপুরা গ্রামীণ জীবিকা মিশন তার ব্যাঙ্ক সখী উদ্যোগের জন্যে সিআইপিএস ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড ২০২৪ লাভ করেছে। তিনি বলেন, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে উচ্চমানের কর্মসম্পাদনের জন্যে ত্রিপুরা জাতীয় স্বীকৃতি লাভ করেছে। ২,৫৪৪টি অফিসে (জিপি/ভিসি স্তর পর্যন্ত) পুরোপুরিভাবে ই-অফিস বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ই-ক্যাবিনেট চালু করেছে, যার মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪৩টি বৈঠক এবং ৫৯৫টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এরফলে ক্যাবিনেটে কাগজবিহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ত্রিপুরা জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে। রাজ্যপাল বলেন, জনজাতি মানুষদের কল্যাণ ও উন্নয়নেও রাজ্য সরকার সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জনজাতি কল্যাণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনে উল্লেখযোগ্য কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ত্রিপুরা ৩টি মর্যদাপূর্ণ জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছে।
পিএম-জনমন এবং ধরতি আবা জনভাগিদারী অভিযান বাস্তবায়নে ত্রিপুরা সেরা কর্মসম্পাদনকারী রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, ২০২৫ সালের খারিফ মরশুমে উচ্চফলনশীল ধানের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ‘মুখ্যমন্ত্রী ইন্টিগ্রেটেড গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়েছে, যা ৪৭,৯৪৭ হেক্টর জমিতে কার্যকর করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ রবি শষ্য ঋতুতে ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধান চাষের জন্যে ‘মুখ্যমন্ত্রী শষ্য শামলা যোজনা’ চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পে কৃষকদের প্রতি হেক্টরে ৪ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ২.৭১ লক্ষ কৃষককে নিয়ে একটি রেজিস্টার তৈরি করছে। প্রতি জেলায় একটি গ্রামে ডিজিটাল ক্রপ সার্ভে বাস্তবায়ন করছে এবং ভারত সরকারের কাছ থেকে ৬০ কোটি টাকার স্পেশাল অ্যাসিস্ট্যান্স পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার মুখ্যমন্ত্রী প্রাণীসম্পদ বিকাশ যোজনার আওতায় মহিলা ক্ষমতায়ন ও জীবিকা সংক্রান্ত সহায়তা দানের উপর অগ্রাধিকার দিয়েছে। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রাণীসম্পদ বিকাশ যোজনা নামে একটি নতুন প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
রাজ্য সরকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সেই লক্ষ্যে ৬৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭৮.৯২ হেক্টর এলাকায় নতুন জলাশয় সৃষ্টি করা হয়েছে। ৪৭৪.৬৬ হেক্টর এলাকাকে সুসংহত মৎস্য চাষের আওতায় আনা হয়েছে এবং ৪.১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯২ হেক্টর অব্যবহৃত জলাশয়কে পুনরায় কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মাছের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্য হ্রাস করার উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার বড় মাত্রায় খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতিতে মৎস্য চাষের উদ্যোগ নিয়েছে।
সেজন্য নাবার্ডের সহায়তায় ১৯.৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ডম্বুর জলাশয় এবং সীতাছড়া লেকে ১৫৮৪টি খাচা স্থাপন করেছে। রাজ্যপাল বলেন, আমবাসা, কাকড়াবন এবং করবুকে ৩টি নতুন সরকারি ডিগ্রি কলেজ স্থাপন করে উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো সম্প্রসারিত করেছে। এই কলেজগুলি ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে চালু হয়েছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার উইমেনস কলেজকে একটি মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ত্রিপুরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে একটি স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
তিনি বলেন, উদয়পুরে একটি বেসরকারি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, মাতা ত্রিপুরাসুন্দরী ওপেন ইউনিভার্সিটি খোলার অনুমোদন দিয়েছে, যার শিক্ষামূলক কার্যক্রম শীঘ্রই শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (এনএইচএম) এবং জাতীয় শহুরে স্বাস্থ্য মিশন (এনইউএইচএম)-এর মাধ্যমে জনগণের জন্যে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে মজবুত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজ্য সরকার ১১৩৩টি হেলথ এন্ড ওয়েলনেস সেন্টার চালু করেছে। রুটিন ইমিউনাইজেশনের মাধ্যমে ২২,২৪৮ জন শিশুকে টিকাদান করা হয়েছে। জননী সুরক্ষা যোজনায় ৩,৯২৬ জন মহিলা উপকৃত হয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি হয়েছে ২৩, ১০৯টি। তিনি বলেন, ত্রিপুরা মেডিকেল কলেজ এন্ড ড. বি আর আম্বেদকর মেমোরিয়াল টিচিং হাসপাতালে এমবিবিএস কোর্সের আসন সংখ্যা ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১৫০ করা হয়েছে। রাজ্য সরকার আগরতলার সাধুটিলাতে নেতাজী সুভাষ স্টেট হোমিওপ্যাথি হাসপাতালে একটি হোমিওপ্যাথি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং উদয়পুরের টেপানিয়াতে একটি আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে চলেছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার উত্তর জেলার দামছড়া, উত্তর জেলার পেঁচারথল এবং দক্ষিণ জেলার মুহুরিপুর ও নীহারনগরে ৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নতুন ভবন উদ্বোধন করেছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ২,৬৪, ১৮-৪টি পরিবারের ৫,৭৮, ১৬০ জন সুবিধাভোগীকে আয়ুষ্মান কার্ড প্রদান করেছে। এতে ৬৮,৭৯৩ জন রোগী পরিষেবা নিতে পেরেছেন এবং বিভিন্ন হাসপাতালে সুবিধাভোগীদের চিকিৎসা বাবদ ৩৫.৩৪ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্থায়ী অবকাঠামোকে প্রাধান্য দিয়ে রাজ্য সরকার মোট ১০,৬১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। এরমধ্যে রয়েছে ১০৫৭ কিলোমিটার রাজ্য সড়ক, ১৭২ কিলোমিটার প্রধান জেলা সড়ক, ৪৮-৩ কিলোমিটার অন্যান্য জেলা সড়ক, ১১৬৭ কিলোমিটার শহুরে রাস্তা এবং ৭,৭৩৮ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার পিএম-জনমন প্রকল্পের আওতায় মোট ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬৭টি সড়কের কাজ করছে ১,৮৯.৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে। রাজ্য সরকার ১১৩.৫৮ কিলোমিটার জাতীয় সড়ককে ‘পেভড শোল্ডার’ সহ দুই লেনের মানে উন্নত করার কাজ করছে। প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারে টেপের মাধ্যমে পানীয়জলের সংযোগ নিশ্চিত করতে চালু করা জলজীবন মিশনে রাজ্য সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাক জলজীবন মিশন সময়ে মাত্র ২৪,৫০২টি গ্রামীণ পরিবারে টেপের মাধ্যমে পানীয়জলের সংযোগ ছিল। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি তারিখ পর্যন্ত ৭.৫ লক্ষ গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ৬,৪৭,৮৫৫টি গ্রামীণ পরিবারে (৮৬.২৮ শতাংশ) পানীয়জলের সংযোগ দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যপাল বলেন, সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ত্রিপুরার ২,৫৫,২৪১ হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে ১,২৩,৭৫৪ হেক্টর জমিকে সেচের আওতায় আনা হয়েছে। ২০২৫ সালে ৯৪টি গভীর নলকূপ ও ৩টি উত্তোলক সেচ প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এতে ১,৪৮৪ হেক্টর জমিতে সেচের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, পিএমএওয়াই গ্রামীণ প্রকল্পে ৩,৭৬ লক্ষ পাকা ঘর এবং রিয়াং পরিবারগুলির জন্যে ১৭,২১৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এবছর আরও ১ লক্ষ ঘর প্রদানের জন্যে ২.৫৬ লক্ষ পরিবারকে নিয়ে নতুনভাবে সমীক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার প্রত্যন্ত এলাকার বসতিগুলির জন্যে ৫০০ কিলোমিটার সর্ব ঋতুপযোগী সড়ক নির্মাণ করতে ‘মুখ্যমন্ত্রী গ্রাম সম্পর্ক যোজনা’ এবং কর্মসম্পাদন ভিত্তিক গ্রামীণ প্রশাসনের উন্নতিকল্পে ‘মুখ্যমন্ত্রী ত্রিপুরা গ্রাম সমৃদ্ধি যোজনা ২.০’ চালু করেছে। রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার ২০টি শহুরে স্বশাসিত সংস্থা এলাকায় প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা-আরবান বাস্তবায়ন করেছে। অনুমোদিত ৮১,০৪২টি ঘরের মধ্যে ৭৪,৮৮০টি ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি ৬, ১৬২টির নির্মাণ কাজ চলছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকারে তত্ত্ববধানে আগরতলা স্মার্ট সিটি মিশনের কাজ এগিয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে ৫৮১.০৭কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৫টি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া মোট ৮৪৪.০৭ কোটি টাকা বিনিয়োগে আরও কিছু বড় প্রকল্প রূপায়িত হয়েছে শহর এলাকায় পরিকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে। রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার ত্রিপুরা আরবান লাইভলিহুড মিশনের অধীনে জীবিকা অর্জনের সুযোগ বৃদ্ধি করেছে।
সেজন্যে ৬৬৪২টি স্বসহায়ক দল/সিআইজি গঠন করেছে। ৩৪৬টি এরিয়া লেভেল ফেডারেশন এবং ৭টি কমিউনিটি লেভেল ফেডারেশন গঠন করেছে। তিনি বলেন, টুয়েপ প্রকল্পকে একত্রিকরণ করে পাঁচবছর মেয়াদী মুখ্যমন্ত্রী নগর উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা হয়েছে এবং প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে দৈনিক মজুরীর পরিমাণ ১৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, রেলপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জনে রাজ্য সরকার বিশেষ সহায়তা প্রদান করেছে। যার ফলে সাব্রুম পর্যন্ত রেললাইনে বৈদ্যুতিকরণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
অমৃত ভারত স্টেশন প্রকল্পের অধীনে রেলস্টেশনগুলির পুনর্নিমানে রাজ্য সরকার সহায়তা করছে। এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ধর্মনগর, কুমারঘাট এবং উদয়পুর রেলস্টেশনগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগরতলা স্টেশনকেও যুক্ত করা হয়েছে। রাজ্য সরকার সড়ক নিরাপত্তাকে ‘রাহ-বীর প্রকল্পের মাধ্যমে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে। ১১ জন গুড সামারিটানকে ২৫,০০০ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার রুদ্রসাগর জলাশয়, ডম্বর জলাশয়, চন্ডীঘাট জলাশয়ে জলপথে পর্যটন সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইকো-ট্যুরিজমের জন্যে হাওড়া ও গোমতী নদীতে টার্মিনাল গ্রীণ ভেসেল ও ফ্লোটিং ডেক তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ‘ত্রিপুরা স্টেট লজিস্টিকস অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করেছে যার অধীনে যোগাযোগ ব্যবস্থা সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং লিঙ্গ সমতার জন্য মহিলা আইটিআইতে ‘শি স্কিলস অ্যান্ড এন্ট্রিপ্রেনিউরশিপ সেন্টার’ চালু করা হয়েছে। রাজ্য সরকার ৯টি শিল্প এলাকার জন্য এডিবি’র অর্থে ত্রিপুরা শিল্প পরিকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প চালু করেছে। রাজ্যপাল বলেন, মুখ্যমন্ত্রী যুব যোগাযোগ যোজনার মাধ্যমে ৫০,৭৭১ জন ছাত্রছাত্রীকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার বেনিফিসিয়ারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার ব্যবস্থার মাধ্যমে কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিকে ডিজিটাইজড করেছে। এতে ১১২টি প্রকল্পের আওতায় ১২.০১ লক্ষ সুবিধাভোগীকে মোট ২০৯৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
রাজ্যপাল বলেন, মুখ্যমন্ত্রী আদিবাসী মহিলা তাঁতশিল্পী উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে ২০,০০০ জন আদিবাসী মহিলা তাঁতশিল্পীকে বিনামূল্যে ১.২৫ কেজি করে তুলার সুতা দেওয়া হয়েছে। এরফলে ঐতিহ্য রক্ষা ও জীবিকা উন্নয়ন দুইই সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, পরিকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কৃতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে ত্রিপুরাকে একটি উদীয়মান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এরফলে পর্যটকের সংখ্যা এবং কর্মসংস্থান উভয়ই বেড়েছে। ছবিমুড়ায় ১০টি নতুন পরিবেশ বান্ধব লগ হাট নির্মাণ করা হয়েছে। এরফলে রাজ্যে স্বদেশ দর্শন প্রকল্পের অধীনে মোট ৫১টি লগ হাট রয়েছে।
রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮,৯৭৭.৫৯ হেক্টর এলাকায় বনায়ন করা হয়েছে। রাজ্য সরকার ত্রিপুরা আগরউড নীতি ২০২১ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। রাজ্যের সব ভোট কেন্দ্র ও প্রশাসনিক স্তরে ১৫তম জাতীয় ভোটার দিবস উদযাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, রাজ্যে ২১টি একলব্য মডেল আবাসিক বিদ্যালয় অনুমোদন করা হয়েছে এবং ১০০টি এসটি হোস্টেলে স্মার্ট ক্লাস চালু করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী রাবার মিশনের আওতায় ২৯,৫৬১ জন জনজাতি সুবিধাভোগী উপকৃত হয়েছেন। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার প্রধান সমাজপতিদের সাম্মানিক ভাতা মাসিক ২,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫,০০০ টাকা করেছে। ধরতি আবা জনভাগিদারী অভিযানের অধীন ৪,০৩৬টি শিবির অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ১২.৭ লক্ষ জনজাতি অংশের মানুষ উপকৃত হয়েছেন। রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার শিক্ষা, অর্থনৈতিক প্রকল্প, পরিকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সহায়তা ও ঋণ প্রদানের মাধ্যমে তপশিলি জাতির সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। রাজ্যে বর্তমানে ৩৯টি এসসি হোস্টেল পরিচালিত হচ্ছে।
যেখানে ৬৮৪ জন আবাসিক শিক্ষার্থীকে আবাসিক ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজ্য সরকার মুখ্যমন্ত্রী তপশিলি জাতি বিকাশ যোজনা চালু করেছে। এর মাধ্যমে দরিদ্র এসসি পরিবারগুলির জন্যে পোল্ট্রি/হাঁস পালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার বৃত্তি, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর সামাজিক অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়নে কাজ করছে। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার মুসলিম, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ, শিখ ও জৈন সম্পদায়ভুক্ত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সামাজিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার বিভিন্ন কেন্দ্র ও রাজ্য সমর্থিত প্রকল্প এবং উদ্যোগের মাধ্যমে দিব্যাঙ্গদের ক্ষমতায়নে কাজ করছে। রাজ্য সরকার প্রধানমন্ত্রী মাত্র বন্দনা যোজনার অধীনে ১৭,০৪৩ জন গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের মধ্যে ৬.২৪ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। রাজ্যে ৩৫টি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ৩.৮৭ লক্ষ সুবিধাভোগী সামাজিক সুরক্ষা পেনশন পাচ্ছেন। তিনি বলেন, রাজ্য সরকার রাজ্যে বর্তমানে ৫৭টি আইসিডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে ১০,৩৬০টি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এর মাধ্যমে ২.৪৭ লক্ষ শিশু এবং ২৭৮৯৫ মহিলাকে পরিষেবা প্রদান করা হচ্ছে।
রাজ্যপাল বলেন, রাজ্য সরকার বৈজ্ঞানিক মনোভাব গড়ে তোলা এবং পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজ্য সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নূন্যতম সহায়ক মূল্যে ৪৩.৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৮,৯৪৭ মেট্রিকটন ধান ক্রয় করেছে। ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ২.৪৪ লক্ষ মেট্রিকটন ধান ক্রয় করা হয়েছে এবং ৪৮৯.৭০ কোটি টাকা সরাসরি কৃষকদের অ্যাকাউন্টে প্রদান করা হয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, রাজ্যে গত ১ বছরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর সময়কালে ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় সামগ্রিক অপরাধের হার ৮.৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সম্পত্তি সংক্রান্ত অপরাধ কমেছে ১৮.৫১ শতাংশ, নারী সংক্রান্ত অপরাধ কমেছে ১১ শতাংশ, ধর্ষণের ঘটনা কমেছে ৩৩ শতাংশ, হত্যাকান্ড কমেছে ২৬ শতাংশ, আঘাত ও মারধোরের ঘটনা কমেছে ১০ শতাংশ। বিষয়টি সম্ভব হয়েছে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং উন্নত পুলিশি তৎপরতার ফলে। রাজ্যপাল বলেন, নেশামুক্ত ত্রিপুরা অভিযানের অধীনে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৫১৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ৩৫০টি এনডিপিএস মামলা করা হয়েছে। এ সময়ে বিপুল পরিমাণে মাদক দ্রব্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি রাজ্যে ২টি নতুন থানার পাশাপাশি ২টি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে এবং ৯৫৩ জন কনস্টেবল ও ২১৮ জন সাব ইন্সপেক্টর নিয়োগ করা হয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, রাজ্যে অগ্নি নিরাপত্তা জোরদার করতে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কালে ৫১টি ফায়ার স্টেশনের মাধ্যমে ৩৫৪টি অগ্নি সচেতনতা ও মকড্রিল পরিচালনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী চা শ্রমিক কল্যাণ প্রকল্পের আওতায় ৩২৮৮ জন চা শ্রমিককে ১৩১.৫২ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। উন্নত দুর্যোগ পূর্বাভাসের লক্ষ্যে মোট ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজ্যজুড়ে ২৪০টি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজ্যপাল বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে রাজ্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
এই সময় জিএসটি বাবদ ৯৯৪২৩ কোটি টাকা, ভ্যাট বাবদ ২৮১.৪০ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক বাবদ ২৭১.৪৮ কোটি টাকা এবং পেশাকর বাবদ ২৬.৮৫ কোটি টাকা সংগৃহীত হয়েছে যা এক মজবুত অর্থনৈতিক ও কর ব্যবস্থাপনার পরিচায়ক। রাজ্যপাল বলেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে ক্রীড়া পরিকাঠামোয় স্বনির্ভরতা অর্জন করা রাজ্য সরকারের লক্ষ্য। নেতাজী সুভাষ রিজিওন্যাল সেন্টারে জাতীয় স্তরে একাডেমি, ভোলাগিরিতে আধুনিক সুবিধা এবং জেলা পর্যায়ে জাতীয় মানের হাব স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার ত্রিপুরার বিচার পরিকাঠামোকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে খোয়াই আদালত ভবনের সম্প্রসারণ সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্রামগঞ্জ, আগরতলা ও কৈলাসহরে নতুন আদালত ভবন নির্মানাধীন রয়েছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত গঠনের লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে যে কর্মযজ্ঞ চলেছে তাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার জন্যে সবার প্রতি রাজ্যপাল আহ্বান জানিয়েছেন।








