ভাদ্রমেলা: অধীর আগ্রহে কমলাসাগরের মানুষ

।। কাকলি ভৌমিক ।।

অনলাইন ডেস্ক, ১৯ আগস্ট ২০২৫: উৎসব ও মেলা মানে মানুষে মানুষে মেলবন্ধন। নানা ভাষা, নানা ধর্ম বর্ণের মানুষের সংস্কৃতির আদান প্রদান। ব্যবসা বাণিজ্য আনন্দ উচ্ছাসের মঞ্চ। রাজ্যে এমনই একটি ঐতিহ্যবাহী মেলা কমলাসাগরের ভাদ্রমেলা। প্রতিবছর ভাদ্রমাসে কৌশিকী অমাবস্যায় বিশালগড় মহকুমার অন্তর্গত কমলাসাগর কসবেশ্বরী কালীবাড়িতে দু’দিনব্যাপী ভাদ্র মেলার আয়োজন রাজ্যের অনন্য কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরম্পরার পরিচায়ক।

রাজধানী আগরতলা থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সবুজে ঘেরা রাজন্য স্মৃতি বিজড়িত কমলাসাগরের কসবেশ্বরী মন্দির। প্রতিবছর জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অগণিত ধর্মপ্রাণ মানুষ, পর্যটক অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন ভাদ্রমেলার জন্য।

মেলা উপলক্ষে দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বিপুল সমাগমে মেলা প্রাঙ্গন আরো বেশী সজীব হয়ে ওঠে। এবছর দু’দিনব্যাপী মেলা শুরু হবে ২২ আগস্ট থেকে এবং চলবে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত।

পারস্পরিক মেলবন্ধন, ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে পূজার্চনা, বিভিন্ন রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বর্ণময় হয়ে উঠবে কসবেশ্বরী কালীমন্দির প্রাঙ্গন।

ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কমলাসাগরের পূর্বনাম ছিল কৈলাগড়। কিংবদন্তী অনুসারে কৈলাগর (কসবায়) দুর্গের মধ্যে সিংহবাহিনী দশভূজা দুর্গা মূর্তিটি স্থাপন করেন মহারাজা কল্যাণ মানিক্য। পঞ্চদশ শতাব্দীতে মহারজা ধন্যমানিক্য (১৪৯০-১৫২০) কমলাসাগর কসবা কালীমন্দিরটি স্থাপন করেছিলেন।

প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, মহারানী কমলাদেবীর ইচ্ছাতেই রাজা ধন্যমানিক্য মন্দির প্রাঙ্গনে কমলাসাগর দিঘীটি খনন করান। রাজা ধন্যমানিক্যের রাজত্বকালে কৈলাগড় বা কসবা এলাকায় দেখা দিয়ে ছিলো অনাবৃষ্টি ও খরা। সেই সময় নাকি মা কালী রাণী কমলাদেবীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এই এলাকায় দীঘি খননের। সে ইচ্ছাই রাণী ধন্যমানিক্যকে বলেছিলেন।

রাণীর ইচ্ছা অনুযায়ী মহারাজা ধন্যমানিক্য কমলাসাগর খনন করান। বর্তমানে কমলাসাগর কালীবাড়ি রাজ্যের একটি প্রসিদ্ধ ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র। আগরতলা-সাবুম জাতীয় সড়কের গকুলনগর রাস্তার মাথা থেকে পশ্চিমদিকে ১৬ কিলোমিটার পীচরাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই রাজন্য স্মৃতি বিজড়িত কমলাসাগর কসবেশ্বরী কালীমন্দির।

এবছর রাস্তারমাথা থেকে কমলাসাগর পর্যন্ত রাস্তাটিকে সংস্কার করে নতুনরূপে গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও কমলা সাগরের কুমিল্লা ভিউ ট্যুরিস্ট লজটিকে সরকারি প্রচেষ্টায় নতুনভাবে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। যাতে পর্যটকদের কাছে এই পুণ্যভূমি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। গত জুলাই মাসে রাজ্য সরকার এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় কমলাসাগর কালীবাড়ি প্রাঙ্গনে এই পর্যটন কেন্দ্রের উন্নয়নের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন।

মোট ব্যয় হবে ১৮.৭৮ কোটি টাকা। বিশেষ করে এখানে অত্যাধুনিক পার্ক, ক্যানোপি, কৃত্রিম ফোয়ারা প্রভৃতি গড়ে তোলা হবে। এছাড়াও দু’দিনব্যাপী মেলাকে কেন্দ্র করে কমলাসাগর দীঘি এবং মন্দির চত্বর সেজে ওঠবে আলোক মালায়, প্রাকৃতিক ফুলের শোভা মন্ডিত গেইট এবং চিত্রায়িত রঙ্গোলীতে। দু’দিনের মেলাতে প্রায় ২৫টি দপ্তরের বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক কাজকর্ম প্রদর্শন করা হবে। স্টলগুলোতে সাধারণ মানুষকে প্রশাসনিক সুযোগ সুবিধাগ্রহণের বিষয়ে সহায়তা করা হবে।

দু’দিনব্যাপী মেলা উপলক্ষে মহকুমার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ক্ষুদ্র ও মাঝারী দোকানীরা পসরা নিয়ে বসবেন। এতে তাদের আর্থিক প্রবৃদ্ধিও হবে। ভাদ্রমেলা আয়োজনের জন্য ইতিমধ্যেই সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কমলাসাগর এলাকার মানুষ, তাদের প্রাণের উৎসবের জন্য।

Leave a Comment