বাংলাদেশে মৌলবাদী তাণ্ডব ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে উত্তাল ত্রিপুরা

প্রগতি ত্রিপুরা, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫: পাশ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় মৌলবাদীদের তাণ্ডব, সংবাদমাধ্যমের উপর ধারাবাহিক হামলা এবং ময়মনসিংহে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যুবক দীপু দাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠল ত্রিপুরা।

এই নৃশংস ঘটনার বিরুদ্ধে উত্তর ত্রিপুরা জেলার ধর্মনগর মহকুমাধীন কালাছড়া বাজারে কালাছড়া ঈদগাহ কমিটির উদ্যোগে এক বিশাল ও প্রতিবাদী মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ঈদগাহ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ মিছিলটি গোটা কালাছড়া বাজার পরিক্রমা করে কালাছড়া স্কুলের সামনে এসে শেষ হয়।

মিছিলজুড়ে প্রতিবাদকারীদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষার জোরালো দাবি।

এই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ঈদগাহ কমিটির অন্যতম সদস্য আব্দুল সুবান, জয়নাল উদ্দিন, মৌলানা আব্দুল জব্বার-সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু সচেতন ও সুবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ।

তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার। প্রতিবাদ মিছিল থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করা হয়।

বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি সুপরিকল্পিতভাবে দেশজুড়ে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও স্বাধীন চিন্তার কণ্ঠস্বরকে নিশানা করছে।

বিশেষ করে দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম আলো’ ও ‘দ্যা ডেইলি স্টার’-এর উপর হামলার ঘটনাকে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করার সুস্পষ্ট অপচেষ্টা বলে অভিহিত করা হয়।

এছাড়াও ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’-এর কার্যালয়ে ভাঙচুর, হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হামলা এবং বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসে হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা।

প্রতিবাদকারীরা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, কিছু উন্মাদ যুবক ধর্ম কিংবা রাজনীতির নামে ভারত-বিরোধী স্লোগান তুলে অশান্তি ছড়াচ্ছে এবং অবাস্তব ও বিপজ্জনক স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠছে। বক্তারা স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭১ সালে ভারতের সহায়তাতেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল।

তাঁরা বলেন, প্রয়োজনে কূটনৈতিক বা অন্যান্য উপায়ে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ক্ষমতা ভারত সরকারের রয়েছে এবং এই বিষয়ে ভারত সরকারের প্রতি তাঁদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

প্রতিবাদ কর্মসূচিতে আরও বলা হয়, যে বাংলাদেশকে একসময় লালন, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনায় চিনত বিশ্ব, আজ সেই বাংলায় ধর্মের নামে বিভাজন ও নির্যাতন মেনে নেওয়া যায় না।

ধর্মের পরিচয়ে সংখ্যালঘু তকমা লাগিয়ে নির্যাতন—সে বাংলাদেশেই হোক বা অন্য কোথাও—অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

কালাছড়া ঈদগাহ কমিটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এই সমস্ত ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের জোরালো দাবি জানানো হয়।

পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

বক্তারা শেষ পর্যন্ত বলেন, যেকোনো দেশে এই ধরনের অশুভ ও বিভাজনমূলক শক্তিকে প্রতিহত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারের সক্রিয় ও কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। শান্তি, সম্প্রীতি ও গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয় এই প্রতিবাদ মিছিল থেকে।

Leave a Comment