নীরমহল জল উৎসব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন

।। তুহিন আইচ।।

অনলাইন ডেস্ক, ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫: নীরমহল জলের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বপ্ন প্রাসাদ। ইতিহাস আর প্রকৃতির সৌন্দর্যের মিলনে এই জল প্রাসাদ আজও ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের প্রতীক। সকালের কোমল রোদ ছুঁয়ে গেলে প্রাসাদের গায়ে উঠে আসে দুধ সাদা দীপ্তি। আর এই নীরমহলকে কেন্দ্র করেই প্রতিবছর সরকারিভাবে আয়োজিত হয় ‘নীরমহল জল উৎসব’।

এক অনন্য ঐতিহ্যবাহীত সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার সম্মিলন। আগামী ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর রাজঘাট থেকে নীরমহল-গোটা রুদ্রসাগর সংলগ্ন অঞ্চল সাজবে রঙিন উৎসবের আবহে। তিনদিন ধরে বর্ণাঢ্য আয়োজন। এতে ইতিহাস ও সংস্কৃতি মহাসম্মেলনের রূপ পাবে। যেখানে মিশবে রুদ্রসাগরের জলের ঢেউ, মানুষের উচ্ছ্বাস এবং সংস্কৃতির অনুরণন।

চূড়ান্ত পর্যায়ের প্রস্তুতিতে বর্তমানে সরগরম রাজঘাট ও মেলাঘর সংলগ্ন অঞ্চল। কোথাও মঞ্চ প্রস্তুতির কাজ চলছে। কোথাও চলছে আলোক ব্যবস্থার ব্যস্ততা। আবার অন্যদিকে ব্যস্ততা লাইফ জ্যাকেটের সঠিক মজুতে। কোথাও চলছে নীরবে নৌকাবাইচের জন্য নৌকার মেরামতি। অন্যদিকে হাতে হাত মিলিয়ে চলছে বিবিধ স্টল সাজানোর কাজ।

স্টলে স্টলে বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী সাজানোর প্রস্তুতি। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও আয়োজিত হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রাজঘাট প্রাঙ্গণে চলছে মঞ্চ নির্মাণের প্রস্তুতি। থাকবে রাজ্যভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতা- পুরুষ ও মহিলা দুই বিভাগেই। থাকছে আকর্ষণীয় এবং জনপ্রিয় নৌকাবাইচ। গ্রামীণ জনপদের প্রাণের স্পন্দন মনসা মঙ্গল প্রতিযোগিতা। এবারের নতুন সংযোজন দলগত যোগা প্রতিযোগিতা।

সাঁতার, নৌকাবাইচ, মনসা মঙ্গল এবং তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা করবে উৎসবের আবহ। তরুণ তরুণীরা জলে নামবে জীবনের জয়গান রচনার জন্য। জল উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ নৌকাবাইচের উত্তেজনা। একসাথে দাঁড় টানা, ঢোলের তালে তালে ছুটে চলা রঙিন নৌকা, দর্শকের হর্ষধুনি-এ যেন জলের বুকে বাঙালির প্রাণের সুর।

নদী ও নদীকেন্দ্রিক গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা মনসামঙ্গল আমাদের ঐতিহ্যেরই ছবি। উৎসবকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম রূপে নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে এই বছর। এইজন্য আয়োজিত হবে দলগত যোগা প্রতিযোগিতা। শরীর ও মনের মিলন ঘটাবে এই আয়োজন। তরুণ প্রজন্মের যোগা প্রদর্শনী উৎসাহিত করবে নবীন প্রবীণদেরও যোগায় উৎসাহিত হবেন তারাও।

নীরমহল জল উৎসবের সবচেয়ে বড় চমক তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। এখানে প্রতিটি প্রতিযোগিতা, প্রতিটি অনুষ্ঠান, প্রতিটি স্টল একে অন্যের প্রতিবেশী হয়ে থাকবে। ক্রীড়া শেখাবে শৃঙ্খলা, মনের আনন্দ ও তৃপ্তি, লোকগাথা জাগিয়ে তুলবে শিকড়ের টান। যোগা দেখাবে শান্ত-স্নিগ্ধ থাকা ও মননশীলতার পথ। আর বর্ণময় সংস্কৃতির আয়োজনে চিত্রিত হবে সৌহার্দ্যের বৃত্ত।

তিনদিনের শেষে যে স্মৃতি জমা হবে তা আগামীর জন্য দলিল হয়ে থাকবে। যে শিশুটি প্রথমবার সাঁতার কাটতে কাটতে মাঝপথে ঘেমে হাল ছাড়েনি, যে কিশোরী প্রথমবার মঞ্চে গান করে হাততালি পেয়েছে, যে বৃদ্ধ নৌকাবাইচের ঢোলের তালে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন, তাদের জন্য এই উৎসব হয়ে থাকবে ব্যক্তিগত বিজয়ের।

তবে উৎসব মানে শুধু আনন্দ আর উচ্ছাস নয়। এটি দায়িত্বও। ত্রিপুরা পর্যটন উন্নয়ন নিগম, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, মেলাঘর পুর পরিষদ, পূর্ত দপ্তর, গ্রামোন্নয়ন দপ্তর, রুদ্রসাগর উদ্বাস্তু মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি-প্রত্যেকে স্ব স্ব দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। চলছে শেষ তুলির টান। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও যথেষ্ট অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে। নিরাপত্তা, উৎসবে নীরব, কিন্তু অবিচ্ছিন্ন অংশ।

এ লক্ষ্যে মহকুমা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই মানুষের আনন্দ নিশ্চিত হবে আয়োজকের সুদৃঢ় সংগঠনে ভর করেই। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও প্রস্তুত থাকবে যেকোন প্রকার দুর্ঘটনা বা অনাকাঙ্খিত ঘটনাকে প্রতিরোধে। যারা এবার প্রথমবারের মতো আসবেন তারা হয়ত উৎসবের শেষে বুঝবেন রূপকথা কেবল পুঁথিতে গাথা থাকে না।

কোন কোন জলাধারের বুকে, কোন কোন প্রাসাদের ছায়ায়, মানুষের মিলনেই রূপকথা রচিত হয়। নীরমহল জল উৎসব সেই বাস্তব রূপকথা-যেখানে সাঁতারের ছপছপ শব্দ, মাঝি মাল্লাদের একসুর, মনসামঙ্গলের সুর, যোগার নিঃশ্বাস, আর সংস্কৃতির মঞ্চ-এই সবকিছুর সম্মেলন এক জলপ্রাসাদ ও একটি জলাধারকে কেন্দ্র করে। আয়োজকরা আশাবাদী শহরের ব্যস্ততা থেকে বেড়িয়ে এসে মানুষ ভরা যৌবনের রুদ্রসাগরের রোমাঞ্চে অবগাহন করবেন।

Leave a Comment