আফ্রিকা ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার, বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থায় আফ্রিকার বৃহত্তর ভূমিকার পক্ষে জয়শঙ্কর

প্রগতি ত্রিপুরা, ৫ অগাস্ট,২০২৬: আফ্রিকা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার—এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেছেন, উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে আরও ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভারত-আফ্রিকা সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা হবে।

বুধবার নয়াদিল্লিতে আফ্রিকা ডে ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারত ও আফ্রিকার সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যৌথ সংগ্রাম এবং একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার উপর প্রতিষ্ঠিত।

জয়শঙ্কর জানান, ভারত মহাসাগরকে ঘিরে হাজার বছরের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান দুই অঞ্চলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার সংগ্রামে ভারত ও আফ্রিকার জনগণ একই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে লড়াই করেছে, যা আজও দুই পক্ষের বন্ধুত্বের অন্যতম ভিত্তি।

মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহ ও অহিংস আন্দোলনের দর্শন বিকশিত হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে কোয়ামে নক্রুমাহ, জুলিয়াস নিয়েরেরে এবং নেলসন ম্যান্ডেলার মতো আফ্রিকান নেতাদের অনুপ্রাণিত করে। তিনি ম্যান্ডেলার সেই বিখ্যাত উক্তিরও উল্লেখ করেন—“আপনারা আমাদের দিয়েছিলেন মোহনদাস গান্ধী, আর আমরা আপনাদের ফিরিয়ে দিয়েছি মহাত্মাকে।”

বিদেশমন্ত্রী জানান, ২০১৮ সালে উগান্ডার সংসদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষিত ‘কাম্পালা নীতি’র ভিত্তিতেই বর্তমানে ভারতের আফ্রিকা নীতি পরিচালিত হচ্ছে। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সামুদ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তিনি জানান, গত এক দশকে ভারত ও আফ্রিকার মধ্যে ১৫০টিরও বেশি উচ্চপর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকায় ১৭টি নতুন ভারতীয় দূতাবাস খোলার ফলে বর্তমানে ৪৬টি আফ্রিকান দেশে ভারতের স্থায়ী কূটনৈতিক উপস্থিতি রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরিসরে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রশ্নে ভারত সবসময়ই সমর্থন দিয়ে এসেছে বলে উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বকালে আফ্রিকান ইউনিয়নের স্থায়ী সদস্যপদ অর্জন ছিল একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। একই সঙ্গে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের মাধ্যমে আফ্রিকার স্থায়ী সদস্যপদের পক্ষে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিতেও আফ্রিকার সমর্থন কামনা করেন।

অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে তিনি জানান, গত বছরে ভারত-আফ্রিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, ওষুধ শিল্প, অবকাঠামো, কৃষি ও ডিজিটাল পরিষেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আফ্রিকায় ভারতের মোট বিনিয়োগ ৮০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।

উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভারত ৪০টিরও বেশি আফ্রিকান দেশে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ১৯০টি ঋণ সহায়তা (লাইন অব ক্রেডিট) দিয়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ২২০টিরও বেশি প্রকল্প ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও বহু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া ২০১৫ সালের পর থেকে অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রদান করেছে ভারত।

মানবসম্পদ উন্নয়নকে ভারত-আফ্রিকা অংশীদারিত্বের অন্যতম স্তম্ভ উল্লেখ করে জয়শঙ্কর বলেন, গত ১১ বছরে আইটিইসি, আইসিসিআর, সিভি রমন ফেলোশিপ এবং ই-ভিবিএব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ৮০ হাজারের বেশি বৃত্তি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাঞ্জিবারে আইআইটি মাদ্রাজ এবং উগান্ডায় ন্যাশনাল ফরেনসিক সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস চালু করা হয়েছে।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের সময় ভারত আফ্রিকার পাশে থেকেছে। গত পাঁচ বছরে ২৫টিরও বেশি আফ্রিকান দেশে খাদ্যশস্য, ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম, দুর্যোগ ত্রাণ এবং মিলেট চাষে সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

Leave a Comment

জিডিএমও-দের নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠান, চিকিৎসকদের নিয়মিত জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির সঙ্গে নিজেদের আপডেট রাখতে হবে : মুখ্যমন্ত্রী