গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মঞ্চে শিশুরাঃ সিপাহীজলাভিত্তিক ভীষ্মদেব স্মৃতি নাট্য উৎসবে অনন্য সংস্কৃতির উন্মেষ

।। তুহিন আইচ ।।
অনলাইন ডেস্ক, ১০ জুন, ২০২৫: শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের সৃজনশীলতা, ভাবপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক চর্চাকে বিকশিত করতে শিশুনাটা উৎসব এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেখানে গ্রীষ্মকালীন ছুটি মানে শিশু মনে অবসর, আমোদ আর প্রমোদ, সেখানে সিপাহীজলা জেলার শতাধিক শিশুশিল্পী এই ছুটিকে রূপ দিল এক সৃজনশীল অভিযাত্রায়।

গ্রীষ্মকালীন স্কুল ছুটিকে শুধুমাত্র বিনোদনে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি শিশুমনের সৃজনশীল বিকাশের দিকে উৎসাহ দেওয়া যায়, তবে তা হয় আরও অর্থবহ। সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ সাধনে ভীষ্মদেব স্মৃতি শিশু নাট্য উৎসব আয়োজন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের বহু বছরের একটি কর্মসূচি। এই উৎসব গত অর্থবছর পর্যন্ত রাজ্যভিত্তিক আয়োজিত হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে দপ্তর এই উৎসবকে জেলাভিত্তিক আয়োজনের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উদ্দেশ্য, আরও ব্যাপকভাবে শিশু নাট্য প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। এরই অঙ্গ হিসেবে গত ৬ জুন বিশ্রামগঞ্জ শচীন দেববর্মণ স্মৃতি কলাক্ষেত্রে আয়োজিত হয়েছে সিপাহীজলাভিত্তিক এই নাট্য উৎসব। শিশুদের শিল্পপ্রতিভা ও সামাজিক চেতনার বিকাশে যা এক অন্যান্য উদাহরণ রূপে প্রতিভাত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এই উৎসব শুধুমাত্র একটি মঞ্চ প্রদর্শন হয়ে থাকে নি। বস্তুত পক্ষে হয়েছে শিশুপ্রতিভার বহুমাত্রিক শিল্প প্রতিভার মঞ্চ।

জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি কার্যালয়ের উদ্যোগে ও বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তর এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের জেলা কার্যালয়ের আন্তরিক সহযোগিতায় এই নাটা উৎসব স্বার্থক রূপ পেয়েছে। এর আয়োজনে জিলা পরিষদ ও অভিভাবকদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সমগ্র আয়োজনে যথার্থ সমন্বয়কের ভূমিকায় থেকেছেন জেলা ও মহকুমা স্তরের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা কমিটির সদস্যগণ। জেলার ৯টি বিদালয় ও ১টি নাট্য সংস্থার শিল্পীগণ এই উৎসবে অংশ নেয়।

শিল্পীদের বয়সের উদ্ধসীমা ছিল ১৬ বছর। উৎসবের সূচনা করেন সিপাহীজলা জিলা পরিষদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভাপতি সীমা ভৌমিক। উপস্থিত ছিলেন জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক রিংকু লাতের, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উপঅধিকর্তা পাঞ্চালী দেববর্মা, বিশিষ্ট নাটাব্যক্তিত্ব পার্থ মজুমদার সহ বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তর এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের জেলা পর্যায়ের আধিকারিকগণ। রুচিসম্মত মঞ্চসজ্জা, নিখুঁত আলোক প্রক্ষেপণ ও শব্দের উপযোগী প্রয়োগে উপস্থাপিত পেশাদার নাট্য আয়োজনকে নিশ্চিতভাবে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।

মঞ্চে একে একে পরিবেশিত নাটকগুলি ছিল ভারত ভাগ্যবিধাতা, পুরাতন ভৃত্য, বীরপুরুষ, নতুন আলোর দিশারী, নৈতিক শিক্ষা, জুতা আবিষ্কার, দেশের মানুষ ও সৎ পরিশ্রমের ভালো ফল। উৎসবের বড় পাওনা ছিল ককবরক ভাষার দুটি নাটক। জম্পুইজলার শ্রীগৌরাঙ্গ বিদ্যামন্দির উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা পরিবেশিত নাটক সামাই কতাল। নিদের্শনায় শচীন কলই। আর একটি ছিল তনুশ্রী দেববর্মার নির্দেশনায় টাকারজলা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পরিবেশনা ‘ফেকুম মানোই বাই গদালজাক লাংমানি ধিনাংগ’।

সর্বনাশা নেশার কুপ্রভাব এবং নেশামুক্ত সমাজ গঠনের উপর পরিবেশিত নাটক দুটি সমাজ সচেতনতার বার্তা বহন করেছে। শিশু শিল্পীদের অভিনয়ে যে দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে তা মুগ্ধ করেছে দর্শক, বিচারক ও অতিথিদের। নাটা ভাষ্যে ও বিষয়বস্তুতে যেমন ছিল পরিবেশ ও মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বার্তা তেমনি ছিল সৃজনশীল উপস্থাপনার সজীব ছোঁয়া। অভিভাবক ও দর্শকদের মনে এই উৎসব সাড়া জাগিয়েছে। চড়িলামের একজন অভিভাবক এসেছিলেন ছেলের নাটক দেখতে।

কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজকের দিনে ছেলে মেয়েদের মোবাইল ফোন থেকে দূরে রাখা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে উঠেছে। সেইখানে নাটকে অভিনয়ের জন্য প্রতিদিনের রিহার্সাল কিছুটা হলেও ছেলে মেয়েদের মোবাইল ফোনের ঝোঁক থেকে দূরে রাখতে পেরেছে। আশা রাখব, মোবাইলের বদলে মঞ্চে অভিনয় আমার ছেলের জীবনবোধকে নিশ্চিতভাবে বদলে দেবে। অবশ্যই এর ফলে জীবনবোধও ভিন্ন দিকে সঞ্চারিত হবে। এই ধরনের সৃজনশীল কাজে সন্তানদের যুক্ত হতে দেখে গর্বিত অভিভাবকেরা নিশ্চিতভাবে নিজেরাও উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।

স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিশিষ্ট জনেরাও ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এই উদ্যোগকে। অনেকেই বলেছেন, আজকের মোবাইল ফোন সর্বস্ব ব্যবহারের বদলে এই নাট্য উৎসবের আয়োজন গঠনমূলক জীবনচর্চায় শিশু মনকে উৎসাহিত করবে। সেরা নাটক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে মেলাঘর আনন্দমার্গ স্কুল। তাদের বিজ্ঞানভিত্তিক নাটকটি দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে যথাক্রমে মেলাঘর ইংরেজি মাধ্যমে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং চড়িলামের ভারতরত্ন অটল বিহারী বাজপেয়ী উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়।

প্রত্যেক দল থেকে একজনকে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা রূপে পুরষ্কৃত করা হয়েছে। গত বছর রাষ্ট্রীয় কলা উৎসবে অংশগ্রহণ করে অভিনয়ের জন্য দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী মেলাঘরের দৃশা লোধকে বিশেষভাবে সম্বর্ধিত করা হয়। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ভীষ্মদেব স্মৃতি শিশু নাট্য উৎসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, সামাজিক সংস্থা সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সাফল্য। এই নাট্য উৎসব শুধুমাত্র নিছক সরকারি কর্মসূচি হয়ে থাকে নি।

সকলের মিলিত প্রয়াসে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই আয়োজন সামাজিক দায়বদ্ধতার চূড়ান্ত নিদর্শন রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মঞ্চে অভিনয় পরিবেশনের উর্দ্ধে উঠে শিশু মনের ভাবনা, কল্পনা ও সমাজ সচেতনতার দলিল হয়ে থেকেছে এই নাটা উৎসব। নাটকের অভিনয় শিশু শিল্পীদের শিখিয়েছে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে, সঠিকভাবে ভাষ্যকে উপস্থাপন করতে। সার্বিকভাবে সঠিক সময়জ্ঞানে নাটকের বিষয়বস্তুকে বোধগ্রাহী করে কিভাবে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা যায়- এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে শিশুদের বড় পাওনা। এই উৎসব নিঃসন্দেহে প্রমাণ করলো শিশুরাই পারে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে আগামীদিনকে আলোকিত করতে নতুন পথ দেখাতে।

Leave a Comment