অনলাইন ডেস্ক, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬: কিয়েভ, ১৩ অক্টোবর: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা বন্ধের সম্ভাব্য সমঝোতা সত্ত্বেও ইউক্রেনের একাধিক জ্বালানি কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সোমবার এমনই অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, রুশ বিমান হামলায় অন্তত ছ’টি জ্বালানি পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে মস্কোর পক্ষ থেকে জ্বালানি ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার সমাজমাধ্যম এক্সে জেলেনস্কি লেখেন, “এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে যে, আমেরিকার প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে রাশিয়া আগ্রহী নয়। আমাদের সাধারণ মানুষ ও জনবসতিকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসমূলক বিমান হামলা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাই রয়েছে তাদের।” তাঁর আরও বক্তব্য, যুদ্ধ পরিচালনার জন্য রাশিয়া যখন বেশি রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা দেখছে, তখনই এ ধরনের হামলা চালানো হচ্ছে।
এর আগে পোল্যান্ডে একটি সম্মেলনে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলেনস্কি জানান, রুশ ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত দুটি স্থাপনার মধ্যে রয়েছে একটি গ্যাস পরিকাঠামো এবং একটি পেট্রল পাম্প।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। এই পরিস্থিতিতে সপ্তাহান্তে তাঁর জ্বালানি যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় কিয়েভ ও ইউরোপের মিত্ররা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়া পরস্পরের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা না চালাতে সম্মত হয়েছে। তবে দুই যুদ্ধরত দেশের তরফে এই সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়নি।
এর কয়েক দিন আগেই রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার একটি চুক্তির কথা ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। পশ্চিমি দেশগুলির দীর্ঘদিনের রাশিয়ার অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন রাখার নীতির পরিপন্থী বলে এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি।
অন্যদিকে, ইউক্রেনীয়দের নির্বাচনের মাধ্যমে জেলেনস্কিকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বানও জানিয়েছেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই দুই নেতার সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ঘোষিত ডিজেল চুক্তিতে যে পরিমাণ রফতানির কথা বলা হয়েছে, তার চেয়েও বেশি মাত্রায় ডিজেল রফতানি পুনরায় শুরু করতে পারবে মস্কো। মার্কিন আইনপ্রণেতাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ এই চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, চুক্তিটি মার্কিন আইন লঙ্ঘন করতে পারে। তবে ট্রাম্প চুক্তির পক্ষে সওয়াল করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠক সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে ট্রাম্পের দূতেরা ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের বলেছিলেন, যুদ্ধের অবসান ঘটাতে রাশিয়াকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরানোই এই চুক্তির উদ্দেশ্য।
গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাম্প এমন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করলেন, যা দুই পক্ষের কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এদিকে, সোমবার ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্ররা সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। তারা কিয়েভের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বৃহত্তম নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস বার্লিনে বলেন, “রাশিয়া কেবল চাপের মুখেই গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করবে। সেই কারণেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি রাখছি আমরা।”
‘আমরা যুদ্ধবিরতি চাই না’, জানাল ক্রেমলিন ইউক্রেন দীর্ঘ পাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনের বক্তব্য, রুশ বাহিনীর ধারাবাহিক হামলা এবং শহরগুলিতে বিদ্যুৎ ও উত্তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টার জবাবেই এই পদক্ষেপ। গত সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার হামলার মুখে রয়েছে ইউক্রেন।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সোমবার রাতভর ইউক্রেন রাশিয়ার কোনও তেল শোধনাগারে হামলা চালায়নি এবং জ্বালানি ক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে তারা প্রস্তুত। তবে রাশিয়া সেই সমঝোতা মেনে চলবে না, এমন সম্ভাবনাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বলে তাঁর দাবি।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্থগিত থাকা নির্বাচন আয়োজনের প্রসঙ্গেও মুখ খুলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তাঁর বক্তব্য, মস্কো যদি ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়, তবে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।
রাশিয়ার তরফে জানানো হয়েছে, সম্ভাব্য জ্বালানি যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং উপযুক্ত সময়ে এ বিষয়ে আরও তথ্য জানানো হবে। তবে ৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ।
তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-সহ ক্রেমলিনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন, আমরা যুদ্ধবিরতি চাই না। আমরা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চাই এবং তা অর্জনের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করতে প্রস্তুত।”
ধ্বংসস্তূপের মধ্যে উদ্ধার দেহ, বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একটি বহুতল আবাসনে নতুন করে রুশ হামলায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে এবং অন্তত ন’জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে হামলায় আরও অন্তত ছ’জনের মৃত্যু হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভেও নতুন করে হামলা চালানো হয়েছে। ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা বিভাগের দাবি, সন্ধ্যার হামলায় ১১ জন আহত হয়েছেন। একটি হামলার জেরে বহুতল আবাসনের প্রবেশপথের একটি অংশ ধসে পড়ে। রাতভর হামলায় খারকিভে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। সোমবার সকালে ফের হামলায় আহত হন অন্তত ২২ জন।
পূর্ব দোনেৎস্ক অঞ্চলের ক্রামাতোরস্কের কাছেও হামলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা কেন্দ্রগুলির অন্যতম এই শহরটির দিকে পশ্চিমমুখী অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে রুশ বাহিনী।
খারকিভের বাসিন্দা নাতালিয়া মিনকা জানান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঠিক আগে তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছতে পেরেছিলেন। তাঁর ও তাঁর সন্তানের ধারণা, একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হেনেছে। তিনি বলেন, “জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাত্র ১০ মিনিট পরেই এই ঘটনা ঘটল।”
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে মিনকা আরও বলেন, “একটি শিশুকে সেখানে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি, তার দেহ ইতিমধ্যেই ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আর তার বাবা কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন।”
প্রায় দু’সপ্তাহ আগে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা শুরু করেছে রাশিয়া। এর জেরে কিয়েভে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকছে। রাজধানীর জল সরবরাহ ও নিকাশি ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দু’বার আচমকা বন্ধ হয়ে গিয়েছে শহরের ভূগর্ভস্থ রেল পরিষেবাও।
এদিকে, মস্কোর ওপর চাপ বজায় রাখতে সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদেশমন্ত্রীরা নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও ১,৫৬৯ জন ব্যক্তি ও সংস্থার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইইউর দাবি, একক প্যাকেজ হিসেবে এটিই এখনও পর্যন্ত তাদের বৃহত্তম নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলাকে ক্রমশ দায়ী করছেন ট্রাম্প। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শনিবার ট্রাম্প জেলেনস্কিকে রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার জন্য কড়া বার্তা দেন। তাঁর বক্তব্য, জেলেনস্কির “এই হামলা বন্ধ করাই উচিত”।








