প্রগতি ত্রিপুরা, ০১ মে, ২০২৬: সরকারি অর্থ খরচ করে ফিতা কাটা আর উদ্বোধনের চাকচিক্য দেখানোই কি এখন উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি? চাকমাঘাটে খোয়াই নদীর তীরে নির্মিত নৌকাঘাটের বর্তমান অবস্থা দেখলে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে। ২০২৪ সালের ১০ মার্চ রাজ্যের জনজাতি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী তথা ২৯ কৃষ্ণপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক বিকাশ দেববর্মা বড়সড় আয়োজনের মাধ্যমে তেলিয়ামুড়া মহকুমা বনদপ্তরের অন্তর্গত মুঙ্গিয়াকামী রেঞ্জের উদ্যোগে চাকমাঘাট নৌকাঘাটের উদ্বোধন করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কিন্তু বাস্তব চিত্র আজ সম্পূর্ণ উল্টো।
উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই নৌকাঘাটটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পরিণত হয়েছে। বিশালাকার গাছ ভেঙ্গে পড়ে ঘাটের একটি বড় অংশ ব্যাবহার অনুপযোগী হয়ে রয়েছে। নদীর ধারে সারিবদ্ধভাবে পড়ে থাকা নৌকা গুলোতে এখন আর পর্যটকের ভিড় নয়, বরং ধুলোবালি আর অবহেলার ছাপ স্পষ্ট। যে প্রকল্প’কে ঘিরে এত প্রচার-প্রচারণা হয়েছিল, সেটিই আজ সরকারি ব্যার্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজ্যের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের তুলনায় এখানে নৌকা ভাড়া এতটাই বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল যে সাধারণ পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলস্বরূপ উদ্বোধনের কিছুদিন পর থেকেই ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় কার্যক্রম। পরিকল্পনার অভাব, দূরদর্শিতার অভাব এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই আজ এই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
অন্যদিকে, নৌকাঘাটের পাশেই অবস্থিত বনদপ্তরের মুঙ্গিয়াকামী রেঞ্জের চাকমাঘাট ফরেস্ট বিট অফিসের চিত্র আরও হতাশাজনক। নৌকা ঘাট পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, এই বিষয়ে খোঁজখবর নিতে মুঙ্গিয়াকামী রেঞ্জ অফিসে পৌঁছালে একজন কর্মীকেও দেখা যায়নি। অফিস কার্যত তালাবদ্ধ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রত্যেকদিনই অফিস একইভাবে বন্ধ থাকে। শুধুমাত্র রাতের বেলায় একজন ফরেস্ট গার্ড পাহারার জন্য থাকেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে অফিসে দিনের বেলায় জনসাধারণ কোনো পরিষেবা পান না, যেখানে কর্মীই নেই, সেই অফিস নির্মাণের যৌক্তিকতা কোথায়? এলাকার মানুষকে সামান্য বনদপ্তর সংক্রান্ত কাজের জন্যও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তেলিয়ামুড়া যেতে হয়। তাহলে কোটি কোটি টাকার সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ করে লাভটা কী হলো?
উল্লেখ্য, এই মুঙ্গিয়াকামী রেঞ্জের চাকমাঘাট ফরেস্ট বিট অফিসটিও ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর তৎকালীন বনদপ্তরের মন্ত্রী অনিমেষ দেববর্মা-র হাত ধরে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু সর্বদা যদি অফিস তালাবদ্ধ থাকে, কর্মী না থাকে এবং জনসেবার কোনো কার্যকর ভূমিকা না থাকে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে সরকারি অর্থের চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
এখন জনমনে একটাই প্রশ্ন—উন্নয়নের নামে কি শুধুই উদ্বোধনী মঞ্চ, ব্যানার, ফেস্টুন আর ফটোসেশন? জনগণের করের টাকায় নির্মিত প্রকল্প গুলোর যদি রক্ষণাবেক্ষণ, পরিকল্পনা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এসব প্রকল্প কি শুধুই রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার?
সরকার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে এলাকার মানুষের দাবি, অবিলম্বে নৌকাঘাট ও ফরেস্ট বিট অফিসের প্রকৃত অবস্থা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হোক। নহেতু এই প্রকল্প গুলো আগামী দিনে “উন্নয়নের স্মৃতিস্তম্ভ” নয়, বরং “সরকারি অর্থ লুট ও অপচয়ের স্মারক” হিসেবেই পরিচিত হবে।








