প্রগতি ত্রিপুরা, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬: একদিকে চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে খুশির জোয়ার, অন্যদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ। শারদোৎসবের প্রাক্কালে রাজধানী আগরতলায় সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে ধরা পড়ল এমনই দুই বিপরীত ছবি। বুধবার টেট-টু উত্তীর্ণ ১,৪৫২ জনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ২০২২ সালের এসটিজিটি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও নিয়োগের দাবিতে শিক্ষা ভবনের সামনে বিক্ষোভ দেখান চাকরিপ্রার্থীরা। একই দিনে ফায়ারম্যান পদে নিয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা দূর করার দাবিতেও সরব হন একদল বেকার যুবক।
চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে শূন্যপদ পূরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে হাজার হাজার বেকার যুবক-যুবতীর। বারবার দপ্তরে আবেদন ও ডেপুটেশন দিয়েও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে।
ফায়ারম্যান নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ: ফায়ারম্যান পদে নিয়োগের দাবিতে বুধবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ডেপুটেশন দিতে যান চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের দাবি, ২০২২ সাল থেকে একাধিকবার দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে দেখা করে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রতিবারই শীঘ্র নিয়োগ সম্পন্ন করার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে প্রক্রিয়ার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষায় প্রায় ১,৮০০ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার পর প্রায় ১,৭০০ জন উত্তীর্ণ হন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন প্রায় ১,৪০০ জন এবং মৌখিক পরীক্ষায় সফল হন প্রায় ১,২০০ জন। এতগুলি পর্যায় অতিক্রম করার পরও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় হতাশ চাকরিপ্রার্থীরা।
তাঁদের অভিযোগ, বারবার দপ্তরে গিয়ে ডেপুটেশন দেওয়া এবং আশ্বাস শোনাই যেন তাঁদের নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। অবিলম্বে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে যোগ্য প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এসটিজিটির ফল প্রকাশের দাবিতে শিক্ষা ভবনে বিক্ষোভ: অন্যদিকে, ২০২২ সালের এসটিজিটি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও নিয়োগের দাবিতে বুধবার শিক্ষা ভবনের সামনে জড়ো হন চাকরিপ্রার্থীরা। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের অভিযোগ, ২০২২ সালে পরীক্ষা দেওয়ার পরও এখনও ফল প্রকাশিত হয়নি। অথচ পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগের অফার দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। বিষয়টি তাঁদের কাছে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
চাকরিপ্রার্থীদের পরিকল্পনা ছিল টিআরবিটি-র চেয়ারম্যান প্রত্যুষ রঞ্জন দেবের সঙ্গে দেখা করে ডেপুটেশন দেওয়ার। কিন্তু তিনি অনুপস্থিত থাকায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি। পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে নিজেদের ক্ষোভ ও দাবি তুলে ধরেন আন্দোলনকারীরা।
চাকরিপ্রার্থীদের বক্তব্য, ২০২২ সালে মোট ২,১৯৩টি শূন্যপদ পূরণের লক্ষ্যে এসটিজিটি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ফল প্রকাশ ও নিয়োগের বিষয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সামনে আসেনি বলে তাঁদের অভিযোগ। এর ফলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী এবং উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইনি জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন চাকরিপ্রার্থীদের: এসটিজিটি নিয়োগে বিলম্বের কারণ হিসেবে আইনি জটিলতার কথা বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। তাঁদের বক্তব্য, সংরক্ষণ নীতি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আদালতে মামলা হলেও তার দায়ভার পরীক্ষার্থীদের উপর চাপানো উচিত নয়। নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে কোনও ত্রুটি বা অসংগতি থেকে থাকলে তা সংশোধন করে সমস্যার সমাধান করার দায়িত্ব সরকারের বলেই মনে করছেন তাঁরা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে সরকার সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ অনুমতিমূলক আবেদন (এসএলপি) দাখিল করেছে। তাঁদের বক্তব্য, আদালতের তরফে নিয়োগে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়নি। তাঁদের দাবি, গত ৯ সেপ্টেম্বর ২৩০টি শূন্যপদের জন্য ফল প্রকাশের বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না কেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
তবে মামলার বর্তমান অবস্থা, আদালতের নির্দেশের সুনির্দিষ্ট পরিধি এবং এসএলপির প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা যায়নি। ফলে আইনি জটিলতার প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
চাকরিপ্রার্থীদের আরও অভিযোগ, তাঁদের নিয়োগের বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলেও পরবর্তী সময়ের পরীক্ষার্থীদের নিয়োগের অফার দেওয়া হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষারত প্রার্থীদের মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি আরও তীব্র হচ্ছে। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে ফল প্রকাশ করে নিয়োগের বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি: দীর্ঘ প্রতীক্ষায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত চাকরিপ্রার্থীরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, উৎসবের মরশুমে যখন বহু পরিবার আনন্দে মেতে উঠেছে, তখন তাঁদের পরিবারে রয়েছে অনিশ্চয়তা ও হতাশা। বছরের পর বছর পরীক্ষার ফল এবং নিয়োগের অপেক্ষায় থেকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
চাকরিপ্রার্থীরা জানিয়েছেন, তাঁরা কোনও বিশেষ সুবিধা চাইছেন না। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত এবং দ্রুত পদক্ষেপই তাঁদের প্রত্যাশা। সরকারের কোনও প্রশাসনিক বা আইনি জটিলতার কারণে প্রক্রিয়া আটকে থাকলে তার সমাধান করে পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে, শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানী আগরতলায় উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ার সন্ধ্যা থেকেই একাধিক পুজোমণ্ডপের দ্বার খুলে যাওয়ায় প্রতিমা দর্শনে ভিড় জমাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বুধবার টেট-টু উত্তীর্ণ ১,৪৫২ জনের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলিতে খুশির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই আনন্দের বিপরীতে শিক্ষা ভবনের সামনে চাকরিপ্রার্থীদের কান্না ও বিক্ষোভ সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
নিয়োগের সময়সীমা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ: ফায়ারম্যান থেকে শিক্ষক—বিভিন্ন পদে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা চাকরিপ্রার্থীদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়সীমার অভাব এবং বারবার আশ্বাস দিয়েও বাস্তব পদক্ষেপ না হওয়ায় তাঁদের ভবিষ্যৎ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। একদিকে নতুন নিয়োগে সাফল্য, অন্যদিকে পুরনো পরীক্ষার ফল ও নিয়োগের অপেক্ষা—এই বৈপরীত্য রাজ্যের কর্মসংস্থান ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সময়মতো নিয়োগ সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
চাকরিপ্রার্থীদের দাবি, আর আশ্বাস নয়, এবার প্রয়োজন নির্দিষ্ট সময়সীমা মেনে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না হলে বেকারদের ক্ষোভ ও আন্দোলন আগামী দিনে আরও জোরদার হতে পারে।







