অনলাইন ডেস্ক, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬: নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া সমাজের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মহিলাদের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য রাজ্য সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ সহ একাধিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তাদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। আজ আগরতলার মহিলা মহাবিদ্যালয়ের মাতঙ্গিনী প্রীতিলতা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা একথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের মন্ত্রী টিঙ্কু রায় এবং উচ্চশিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী কিশোর বর্মন।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষার প্রসার, যুবসমাজের কর্মসংস্থান এবং নারীশিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রাজ্য সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নবনিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক ও যুব সংগঠকদের হাতে নিয়োগপত্র এবং মুখ্যমন্ত্রী কন্যা আত্মনির্ভর যোজনার আওতায় মেধাবী ছাত্রীদের স্কুটি প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা। এদিন মোট ৭৪ জন নবনিযুক্ত সহকারী অধ্যাপকের হাতে নিয়োগপত্র এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের ১০ জন নবনিযুক্ত যুব সংগঠকের হাতে অফার লেটার তুলে দেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী কন্যা আত্মনির্ভর যোজনার আওতায় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৩০ জন এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১২২ জন সহ মোট ১৫২ জন মেধাবী ছাত্রীকে হেলমেট এবং স্কুটি বিতরণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এগুলি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের সংলগ্ন আউটলেটগুলি থেকে ছাত্রীরা কালেক্ট করবে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহা বলেন, রাজ্যের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, যুবসমাজকে আত্মনির্ভর করে তোলা এবং ত্রিপুরার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলা রাজ্য সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আজকের অনুষ্ঠান সেই লক্ষ্য পূরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মেয়েরা যাতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আরও উৎসাহিত হয় এবং কলেজে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সুবিধা পায়, সেই উদ্দেশ্যেই মুখ্যমন্ত্রী কন্যা আত্মনির্ভর যোজনা চালু করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ৩০ জন এবং ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ১২২ জন সহ মোট ১৫২ জন মেধাবী ছাত্রীকে স্কুটি প্রদান করা হয়েছে। এই উদ্যোগ ছাত্রীদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করার পাশাপাশি তাঁদের স্বনির্ভরতার পথকে আরও সুগম করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কথা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, এমবিবি কলেজের জন্য ৭৭ কোটি টাকা এবং উদয়পুরের নেতাজি সুভাষ মহাবিদ্যালয়ের জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই অর্থে নতুন বিজ্ঞান ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
নরসিংগড়ে ত্রিপুরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পরিকাঠামো উন্নয়নে ১৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য প্রায় ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগরতলার কুঞ্জবনে ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ ইন এডুকেশনের ভবন সম্প্রসারণের কাজও চলছে। তিনি আরও জানান, রাজ্যের বিভিন্ন কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিলোনীয়ার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলেজের নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণে ২৩৪ কোটি টাকা, করবুকের সরকারি ডিগ্রি কলেজের নতুন ভবন নির্মাণে ৮২ কোটি টাকা, আগরতলার রামঠাকুর কলেজের নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৪৪ কোটি টাকা এবং জিরানিয়ার তুলাকোনাস্থিত সরকারি ডিগ্রি কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়নে ৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
এছাড়াও এমবিবি কলেজ ক্যাম্পাসে ১,০০০ আসনবিশিষ্ট অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের ছাত্রছাত্রীদের উন্নতমানের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ দিতে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পানিসাগর, আমবাসা, কাকড়াবন ও করবুক সহ বিভিন্ন স্থানে সরকারি ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। নলছড়ে মহিলা কলেজ এবং ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট উইমেন্স ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মাধ্যমে নারীশিক্ষার প্রসারেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ত্রিপুরা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিকে স্টেট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ রাজ্যের প্রযুক্তিগত শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান যুগকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ফাইভ-জি প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল শিক্ষার যুগ হিসেবে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ছাত্রছাত্রীদের শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি সেই জ্ঞান বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে হবে। এই লক্ষ্যেই বিভিন্ন কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্ট ক্লাসরুম, আধুনিক গবেষণাগার এবং উন্নত শিক্ষার পরিকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে রাজ্যের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষাকে আরও কর্মমুখী, আধুনিক ও বাস্তবসম্মত করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যুবসমাজই রাজ্যের ভবিষ্যৎ। তাঁদের শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষ করে তুলতে হবে। যুবসমাজকে প্রকৃত মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি জানান, ইউপিএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য ‘লক্ষ্য’ স্কলারশিপ প্রকল্প, দিব্যাঙ্গ শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা এবং আগরতলা, উদয়পুর ও আমবাসায় উন্নতমানের কোচিং সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ডাই-ইন-হারনেস প্রকল্প সহ সর্বমোট ২৩,৯০০ জনকে চাকরি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজের প্রয়োজন মেটাতে চুক্তিভিত্তিক ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের মন্ত্রী টিঙ্কু রায় বলেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রফেসর (ডা.) মানিক সাহার নেতৃত্বে রাজ্য সরকার মেয়েদের শিক্ষা, খেলাধুলা ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধির জন্য একাধিক প্রকল্প চালু করেছে। তিনি জানান, সিএম-সাথ প্রকল্পের আওতায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাসিক ৫,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা, যোগ্য ছাত্রীদের নামে ৫০,০০০ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট এবং প্রতিভাবান মহিলা ক্রীড়াবিদদের প্রশিক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সমাজকল্যাণ ও সমাজশিক্ষা দপ্তরের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। যুব বিষয়ক ও ক্রীড়ামন্ত্রী বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মনোবল বৃদ্ধি করবে এবং তাঁদের নিজেদের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী কিশোর বর্মন বলেন, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্বনির্ভর করে তোলার লক্ষ্যে রাজ্য সরকার নিরন্তর কাজ করে চলেছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সমস্যা কমাতে ১৫২টি স্কুটি প্রদান এবং উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে নবনিযুক্ত সহকারী অধ্যাপক ও যুব সংগঠকদের হাতে নিয়োগপত্র ও অফার লেটার তুলে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, শিক্ষকরা শুধু শিক্ষাদান করেন না, তাঁরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলিও গড়ে তোলেন। শিক্ষার্থীদের সাফল্যের পিছনে তাঁদের কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবদানও অনস্বীকার্য। উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনে ত্রিপুরা তথা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন উচ্চশিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তা অনিমেষ দেববর্মা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া দপ্তরের সচিব তাপস রায়, দপ্তরের অধিকর্তা লালনেইথুয়ামা ডার্লং, মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষা সঞ্চিতা দেববর্মা, বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক-অধ্যাপিকা, ছাত্রছাত্রী, নিয়োগপত্র ও অফার লেটার প্রাপক এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।








