হাতজোড় ক্ষমা আর পচা সমাজের আঁতাতে শ্রীনগরে বিকিয়ে গেল নিষ্পাপ শৈশব!

প্রগতি ত্রিপুরা, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬: ​যে বিদ্যাশ্রমে দেবী সরস্বতীর শুভ্র আবাহন আর অবোধ শিশুদের কলকাকলিতে ভোরের আলো ফোটার কথা ছিল, সাব্রুম মহকুমার শ্রীনগর হায়ার সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ের আকাশে-বাতাসে আজ সেখানে পচাগলা সামাজিকতার দুর্গন্ধময় অন্ধকার। সুরক্ষার নামে যে প্রাঙ্গণে সাময়িক আশ্রয় পেয়েছিল বিএসএফ, সেখানেই রচিত হলো এক কদর্য নরককাব্য!

​গত ২৩ শে সেপ্টেম্বর, বুধবার— ভিলেজ কাউন্সিল নির্বাচনের নিরাপত্তার চাদরে আসা এক বিএসএফ কর্মীর পশুবৃত্তির শিকার হয় একাধিক কোমলমতি স্কুল ছাত্রী। চিপসের প্রলোভন আর অস্ত্রের দম্ভে পাঁচ-ছয়টি অবোধ শিশুর সরলতাকে যে কদর্য কামনার নাগপাশে জড়ানো হলো, তা কোন অন্ধ সভ্যতার নিদর্শন? বৃহস্পতিবার সকালে পীড়িতা ছাত্রীদের অভিভাবকরা প্রধান শিক্ষককে লিখিতভাবে জানালে বিদ্যালয়ের দৌড়ঝাঁপে খবর পৌঁছায় এস ডিএম, বিডিও ও এস ডি পিওর কাছে।

সাথে সাথেই সাব্রুম মহকুমা প্রশাসক, এসডিপিও এবং বিডিও ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে ঘটনার কঠোর নিন্দা জানান এবং নিজেরা বসে বিষয়টি নিয়ে শ্রীনগর আউট পোস্টে একটি এফ আই আর দায়ের করান বিদ্যালয়ের মাধ্যমে এবং প্রকৃত দোষীকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি ব্যবস্থা করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন।দোষীকে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের আশ্বাস থাকলেও প্রমাণের বেড়াজাল আর পারিবারিক সমঝোতার নাগপাশে কি বাঁধা পড়লো গোটা আইন ব্যবস্থা? কেন সেই এফআইআর তুলে নেওয়া হয় পরিবারের পক্ষ থেকে? আর সেখানেই অভিযুক্ত বিএসএফ জোয়ানের কেবল হাতজোড় করে ক্ষমা চাওয়ার প্রহসনেই থামিয়ে দেওয়া হলো ন্যায়ের চাকা!

​প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার আইনি সহযোগিতা প্রদান করার আশ্বাস দিলেও কোন গোপন ‘মুচলেকা’র জালে, কোন অদৃশ্য রক্তচক্ষু কিংবা বিপুল অঙ্কের নোংরা অর্থ লেনদেনের মেঠো অংকে স্তব্ধ হলো নিষ্পাপ শৈশবের আর্তনাদ? যে জঘন্য অপরাধের একমাত্র পরিণতি হওয়া উচিত ছিল কঠিন আইনি সাজা, তা কীভাবে স্রেফ একটি মাফ চাওয়ার নামমাত্র আপসে ধামাচাপা পড়ে?

​এই চরম সামাজিক অবক্ষয়ে সবচেয়ে বড় ধিক্কার আমাদের মেরুদণ্ডহীন সমাজব্যবস্থাকে! কোথায় আজ কাগজ-কলমে ঢাকঢোল পেটানো ‘বালিকা মঞ্চ’? শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের বন্ধ্যা সেমিনার আর চটকদার আস্ফালনে যাদের অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ, ফুটফুটে শিশুদের সম্ভ্রম যখন বিদ্যালয়েই বিকোচ্ছিল, তখন কোথায় ভেসে গেল তাদের তথাকথিত দরদি ভূমিকা? অন্যায়ের সামনে এই বধির নীরবতা কি নপুংসক দেউলিয়াপনারই উলঙ্গ প্রকাশ নয়?

​শ্রীনগরের এই ঘটনা স্রেফ একটি আইনি অপরাধ নয়; এটি আমাদের চরিত্রহীন সমাজের পচে যাওয়া বিবেকের এক নগ্ন দলিল। আজ যদি এই নক্কারজনক সামাজিক আত্মসমর্পণ ও পচনের বিরুদ্ধে দাবানলের মতো প্রতিরোধ না জাগে, তবে আগামী দিনে প্রতিটি বিদ্যাশ্রমে সরস্বতীর আসন উল্টে তৈরি হবে নিষ্পাপ শৈশবের একেকটি শ্মশানঘাট!

Leave a Comment