প্রগতি ত্রিপুরা, ২৬ আগস্ট, ২০২৬: চীন ও নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় বুধবার সকালে আঘাত হানল ধ্বংসাত্মক আকস্মিক বন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) এবং ভয়াবহ ভূমিধস। এই দুর্যোগে তাৎক্ষণিকভাবে বহু মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
চীনা রাষ্ট্রীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে এই বিপর্যয় শুরু হয়। মুহূর্তেই তা চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের শিগাৎসে শহরের অন্তর্গত গ্যিরং কাউন্টির গ্যিরং পোর্ট চেকপোস্টে ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, চোখের পলকে একটি বিশাল ভূমিধস গ্যিরং চেকপোস্টের ওপর আছড়ে পড়ে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি করলেও নিমেষেই চারপাশ কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যায়।
গ্যিরংয়ের উদ্ধার কমান্ড সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত কেবল ওই কাউন্টি থেকেই ৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে, নেপালি পুলিশের বরাত দিয়ে সাংহাইয়ের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পেপার’ জানিয়েছে, নেপালে ইতিমধ্যে ৯৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৫৪ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে ৯৩ জন নেপালি এবং ২৯১ জন বিদেশি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং নেদারল্যান্ডসের নাগরিকরা রয়েছেন। এছাড়া আরও ১১১ জনের জাতীয়তা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
কাটমান্ডু ইউনিভার্সিটির জলবায়ু গবেষক ও অধ্যাপক রিজান ভক্ত কায়স্থর প্রাথমিক অনুমান, উপরিভাগের লেন্দে খোলা নদীতে কোনো বরফস্তূপ বা আইস অ্যাভালাঞ্চ পতনের ফলে হঠাৎ অতিরিক্ত পানির সৃষ্টি হয়। যার তীব্র স্রোত ভোতেকোশী নদীতে নেমে এসে এই ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাডের সৃষ্টি করেছে। নেপাল ও চীনের বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রাথমিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ঘটনার পর পরই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনা, নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের সুচিকিৎসা এবং সম্ভাব্য গৌণ দুর্যোগ (সেকেন্ডারি ডিজাস্টার) এড়াতে কড়া নজরদারি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে পিপলস আর্মড পুলিশের সশস্ত্র বাহিনী ও সেনা দল। নিরাপত্তা ও উদ্ধারকাজের স্বার্থে গ্যিরং চেকপোস্টের দিকে যাওয়ার মূল সড়কটি আগামী সাত দিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নির্মাণ ও জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান ‘চীন আন্নেনং কনস্ট্রাকশন গ্রুপ’ ড্রোন, থ্রিডি লেজার স্ক্যানার এবং লাইফ ডিটেক্টরের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসহ ২০০ জনের একটি বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল দুর্ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে।
এদিকে, নেপালে অবস্থিত চীনা দূতাবাসও জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। চীন নিউজউইকের খবর অনুযায়ী, তিব্বত তিয়ানলু কনস্ট্রাকশন কোম্পানির একটি মহাসড়ক মেরামত প্রকল্পে নিয়োজিত প্রায় ৬০ জন চীনা কর্মী এই বিপর্যয়ের কবলে পড়েছেন। বন্দরের কাস্টমস ভবন থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কোম্পানির অফিস এবং সংলগ্ন নিম্নমানের আবাসিক ভবনগুলো জলের তোড়ে সম্পূর্ণ ভেসে গেছে।
চীন ও নেপালের মধ্যকার বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার হলো এই গ্যিরং পোর্ট। চীন নেপালের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার, যার হিস্যা মোট বাণিজ্যের প্রায় ১৬.৯ শতাংশ। তবে চলতি বছরের বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যার কারণে দুই দেশের মধ্যকার সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের সঙ্গে এই সড়ক ও বাণিজ্য যোগাযোগ নেপালের জন্য লাইফলাইন বা জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে। ২০১৭ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এ যোগ দিলেও বারবার আবহাওয়া সংক্রান্ত প্রতিকূলতা এবং অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দুই দেশের যৌথ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি থমকে রয়েছে। বর্তমান এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিল।







