প্রগতি ত্রিপুরা, ১০ জুলাই, ২০২৬: ত্রিপুরায় উন্নত, আধুনিক ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. মানিক সাহা। তিনি বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির বিনিয়োগ এবং অংশীদারিত্ব রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করবে।
একটি বেসরকারি হাসপাতালের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই বেঙ্গালুরুর ত্রিপুরা মণ্ডলী-র সামাজিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ত্রিপুরার দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিকেলে ভর্তি হওয়া আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তারা এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তিনি বলেন, রাজ্য সরকার স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ডিজিটাল হেলথ সিস্টেম চালুর মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসকদের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনার ব্যবস্থাও রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, স্বাস্থ্য, পর্যটন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও উদ্যানপালনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকার একাধিক বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রিপুরা বিজনেস কনক্লেভে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি বিনিয়োগকারী অংশগ্রহণ করেছেন, যা রাজ্যের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন। উন্নত আইন-শৃঙ্খলা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কারণেই এই আগ্রহ বাড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, রাজ্যের মানুষ যাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যেই সুপার স্পেশালিটি চিকিৎসা পরিষেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আগরতলা গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজে সুপার স্পেশালিটি পরিষেবা চালু হয়েছে। ইতোমধ্যেই রাজ্যে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে হার্ট ও লিভার ট্রান্সপ্লান্ট চালুর লক্ষ্যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের প্রশংসা করে বলেন, চিকিৎসকদের প্রতি মানুষের আস্থা ও সম্মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর ব্যবহার সম্পর্কে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি আরও জানান, রাজ্যে টেলিমেডিসিন পরিষেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, যাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীদের সহজে সংযোগ স্থাপন করা যায়। পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে সর্বজনীন টিকাকরণের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। বর্তমানে রাজ্যের ৮১.৭ শতাংশ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া ‘মুখ্যমন্ত্রী সুস্থ শৈশব’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পুষ্টি, আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বাল স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় জন্মগত ত্রুটি, ক্লাব ফুট, ঠোঁট ও তালুকাটা, জন্মগত হৃদরোগ এবং শ্রবণ সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে। নতুন হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজের নতুন ভবন, ডি-অ্যাডিকশন ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে জেলা হাসপাতালগুলিকেও ধাপে ধাপে আরও উন্নত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বিকশিত ভারত’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যখাতের আধুনিকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো—ত্রিপুরার প্রতিটি মানুষ যেন নিজের রাজ্যেই উন্নত, আধুনিক ও সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা পান এবং চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে বাধ্য না হন।
বক্তব্যের শেষে তিনি স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, বেসরকারি হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানান এবং তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ত্রিপুরার স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।








